
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, গতকাল
হরতালে সারাদেশে মানুষ যেভাবে রাজপথে নেমে এসেছে, তাতে গণঅভ্যুত্থানের মতো
অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এই অভ্যুত্থান ঠেকাতে বিরোধী দল দমনে সরকার এখনও
দুর্বিনীত। কিন্তু সরকারের মনে রাখা উচিত, র্যাব, পুলিশ, বিজিবি কিংবা দলীয়
ক্যাডার দিয়ে জনতার
আন্দোলন ঠেকানো যাবে না।
গতকাল নয়াপল্টনে প্রথম দিনের ১০ ঘণ্টা হরতালের পর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি
সারাদেশে হত্যা, হামলা ও গ্রেফতারের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, সারাদেশে এ পর্যন্ত ১৮ দলের তিনজন নিহত হয়েছেন।
গ্রেফতার করা হয়েছে ছয় শতাধিক নেতাকর্মীকে। আহত হয়েছেন ১৫শ’ জন। ১৫ হাজারের
বেশি নেতাকর্মীকে আসামি করে মামলা দেয়া হয়েছে। এছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত ১২
জনকে ছয় মাস করে কারাদণ্ড দিয়েছে।
টানা ৬০ ঘণ্টা হরতালের প্রথম দিনে সারাদেশে পুলিশ-র্যাব-বিজিবিসহ আওয়ামী
লীগের সন্ত্রাসীরা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর গুলিবর্ষণ, হামলা ও
গ্রেফতারের ঘটনা তুলে ধরে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, একদিকে মুখে সমঝোতা ও
সংলাপের কথা বললেও তাদের অন্তর্গত স্বচ্ছতা নিয়ে আমরা সন্দিহান। বিরোধী দল
দমনে সরকার আগের মতোই দুর্বিনীত ও অপরিণামদর্শী আচরণ করছে। বরাবরের মতো আজও
(গতকাল) তারা সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং তাদের পাখনার নিচে পালিত
ছাত্রলীগ-যুবলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা নিষ্ঠুর পাশবিকতায় মেতে উঠেছে।
তাদের হাতে তিনজন নিহত হওয়ার খবর আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে।
হরতাল আহ্বান সম্পর্কে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বিএনপি গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন
দাবিতে ১৬ কি ১৭ দিন হরতাল করেছে। শুধু নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আজ থেকে
তিনদিনের হরতাল করছি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ১৯৯৫-৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক
সরকারের জন্য ১৭৩ দিন হরতাল করেছিল। লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ হত্যা করে
মৃতদেহের ওপর নৃত্য করেছিল। এসব নানা নারকীয় ঘটনা দেশের মানুষ ভুলে যায়নি।’
সংলাপ সম্পর্কে দলের অবস্থান পুনরুল্লেখ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
বলেন, আমরা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলতে চাই, বিদ্যমান শঙ্কা, অস্বস্তি ও
নৈরাজ্য দূর করতে হলে সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। সংলাপে নির্বাচনকালীন
নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থার নীতিগত বিষয়টি আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু
হতে হবে। অন্যথায় সরকারের সমঝোতা ও সংলাপের আহ্বান জনগণের কাছে
বিশ্বাসযোগ্য হবে না।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকার শেষ সময়ে এসে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন
করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা বুঝতে পেরেছে, বিএনপি নির্বাচনে এলে তাদের
আর ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা নেই। সেজন্য বিএনপিকে বাদ দিয়ে একদলীয় নির্বাচন
করতে নানা কৌশল করছে।
তিনি বলেন, সরকার সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। বিভিন্ন জায়গায়
১৪৪ ধারা জারি করা হচ্ছে। আমি অবিলম্বে সরকারকে সভা-সমাবেশের ওপর থেকে
নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে আহ্বান জানাচ্ছি।
সরকারের দ্বৈতনীতির কঠোর সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, একদিকে
সভা-সমাবেশ-মিছিল বন্ধ করা হয়েছে অথচ সরকারি দলের নেতাকর্মীরা রাজধানীতে
পুলিশের ছত্রছায়ায় মিছিল করছে; অন্যদিকে বিরোধী দলকে মিছিল তো দূরের কথা,
কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রেখেছে।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মনিরুজ্জামান রেজিনকে
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে পুলিশ আটক করার পর তার কোনো সন্ধান মিলছে
না দাবি করে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, আটকের পর রেজিনকে পুলিশ বলেছে, তোমার
সিনিয়র নেতাদের আসতে বলো, তাহলে তোমাকে ছেড়ে দেবো। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত
রেজিনের কোনো হদিস পুলিশ দিচ্ছে না। বিষয়টি আমাদের কাছে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা
সৃষ্টি করেছে। তিনি অবিলম্বে রেজিনের মুক্তির দাবি জানান।
মির্জা ফখরুল অভিযোগ করেন, চলমান আন্দোলন ও গণতন্ত্রকে নস্যাত্ করতে
সরকারের এজেন্টরা প্রধান বিচারপতিসহ বিচারপতি ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে
বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটাচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকারের এজেন্টরা নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের
দাবিতে চলমান আন্দোলন ও গণতন্ত্রকে নস্যাত্ করতে এই অপকর্ম করছে। এসব
দুষ্কৃতকারীকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
একই সঙ্গে হরতাল কর্মসূচিতে সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের যানবাহনে হামলার ঘটনায়
নিন্দা জানিয়ে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য দল ও জোটের
নেতাকর্মীদের প্রতিও আহ্বান জানান ফখরুল।
হরতালের প্রথম দিনে হেয়ার রোডে প্রধান বিচারপতির বাসভবনের কাছে এবং
শেরেবাংলা নগরে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের সামনে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা
ঘটে। তবে এসব ঘটনায় কাউকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি।
নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গতকাল বিকালে ৬০ ঘণ্টার হরতালের প্রথম
দিনের পরিস্থিতি তুলে ধরতে এই সংবাদ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।
নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে ১৮ দলীয় জোট সারাদেশে
গতকাল রোববার ভোর ৬টা থেকে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত লাগাতার ৬০ ঘণ্টার
হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। শনিবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় খালেদা
জিয়া এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
হরতালের আওতামুক্ত : মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ও লেবেল
পরীক্ষার্থীরা হরতালের আওতামুক্ত থাকবে। ইতোমধ্যে আমরা এ বিষয়ে ঘোষণা
দিয়েছি। হজ শেষে হাজীরা দেশে ফিরে আসছেন। তাদের বহনকারী যানবাহনও হরতালের
বাইরে থাকবে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড ম্যাচ। ওই ম্যাচের
খেলোয়াড়-কর্মকর্তাদের বহনকারী গাড়িও হরতালের আওতামুক্ত থাকবে।
সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের যানবাহনের ওপর বোমা হামলার ঘটনাকে সন্ত্রাসীদের
কর্মকাণ্ড অভিহিত করে তিনি বলেন, আমরা সংবাদপত্রের গাড়ির ওপর হামলার ঘটনার
নিন্দা জানাচ্ছি। আমি ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের বলব, এ ধরনের ঘটনা ঘটলে
আপনারা ব্যবস্থা নেবেন।
হরতাল শুরুর আগে থেকে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ৭১, দেশ টিভি, চ্যানেল
টোয়েন্টিফোরসহ কয়েকটি মিডিয়ার গাড়ি ও কার্যালয়ের সামনে অজ্ঞাতরা বোমা
বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, ঢাকা মহানগর বিএনপির
সদস্য-সচিব আবদুস সালাম, কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল লতিফ জনি, শামীমুর রহমান
শামীম, আসাদুল করীম শাহিন, বেলাল আহমেদ, যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা আ ক ম
মোজাম্মেল, ফরহাদ হোসেন আজাদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।