Search This Blog

Sunday, October 27, 2013

খালেদা জিয়াকে নিয়ে সংসদে ব্যঙ্গ করলেন আ.লীগ নেতারা : তাল মেলালেন প্রধানমন্ত্রীও

গতকাল জাতীয় সংসদে মহাজোটের সংসদ সদস্যরা পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দিয়ে গিয়ে বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে তাদের বিরুদ্ধে একতরফা বিষোদগার করেছেন। এ সময় তারা বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অসংসদীয় ভাষায় বক্তব্য রাখেন। সরকার দলীয় সিনিয়র সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম কণ্ঠ পরিবর্তন করে মেয়েলি কণ্ঠে বেগম জিয়াকে ব্যঙ্গ করেন। তার এই বিকৃত বক্তব্যে সাড়া দিয়ে মহাজোট সদস্যরা হো হো করে হেসে ওঠেন। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনাও তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরে হেসে ফেলেন।
পয়েন্ট অব অর্ডারে মহাজোট সদস্যরা সরকার অবৈধ—বিরোধীদলীয় নেতার এমন মন্তব্যকে ‘সংবিধান লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ’ উল্লেখ করে উল্টো বেগম জিয়াকে বাংলাদেশের মাটিতে অবৈধ বলে আখ্যায়িত করেন। তারা বলেন, খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক নয়, তত্ত্বাবধায়কের ছাতার নিচে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে নস্যাত্ করার টার্গেট নিয়ে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছেন। সাংবিধানিক সরকারের বদলে অসাংবিধানিক সরকার ক্ষমতায় আনতে চাইছেন। দেশের সচেতন মানুষ তা কোনো দিনই হতে দেবে না।
মহাজোট সদস্যরা বলেন, যখনই প্রধানমন্ত্রী সংলাপের উদ্যোগ নেন, তখনই খালেদা জিয়া আল্টিমেটাম দিয়ে তা নস্যাত্ করে দেন। খালেদা জিয়ার প্রতি প্রশ্ন রেখে তারা বলেন, ২৭ তারিখ থেকে সরকার অবৈধ হলে তবে এখন সরকারে কে আছে? আপনি (খালেদা জিয়া) কী অন্য কাউকে দাওয়াত দিচ্ছেন? গণতন্ত্র হত্যার ষড়যন্ত্র করছেন? সরকার অবৈধ হলে সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারাও অবৈধ হয়ে যাবে, তবে তাদেরকে বেতন-ভাতা কী আপনি দেবেন? আপনি দেশে আসলে কী করতে চান? আগুন নিয়ে খেলবেন না। মহাজোট সদস্যদের বক্তব্যে সমর্থন জানিয়ে এ সময় স্পিকারের দায়িত্ব পালনরত ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলী বলেন, বাইরে অনেকে অনেক কথায় বলেন। এসব কথার সাংবিধানিক কোনো ভিত্তি নেই। আমরা সংবিধান মেনে চলবো। দেশ সংবিধান অনুযায়ীই চলবে।
মাগরিবের নামাজের বিরতির পর পয়েন্ট অব অর্ডারে জাসদের কার্যকরী সভাপতি মইনউদ্দিন খান বাদল এক অনির্ধারিত আলোচনার সূত্রপাত করেন। দীর্ঘ এ আলোচনায় অংশ নেন সরকারি দলের সিনিয়র নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, দফতরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নু।
আলোচনায় অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা আমির হোসেন আমু বলেন, খালেদা জিয়ার আন্দোলন তত্ত্বাবধায়কের ছাতার নিচে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার আন্দোলন। খালেদা জিয়া কোনো দিনই তত্ত্বাবধায়কে বিশ্বাস করেননি, এখনও বিশ্বাস করেন না। তা আমরা বারবার প্রমাণ দিয়েছি। খালেদা জিয়ার আন্দোলন গণতান্ত্রিক নয়, তার আন্দোলন বাংলাদেশকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো অকার্যকর ও ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার আন্দোলন। আসলে খালেদা জিয়া জামায়াতের কাছে জিম্মি। প্রধানমন্ত্রী ফোন করে প্রমাণ করেছেন তিনি দেশ ও জাতির ভালো চান, হানাহানির বদলে শান্তি চান। অথচ খালেদা জিয়া সামান্য রাজনৈতিক শিষ্টাচার দেখাতে পারেননি।
তিনি বলেন, খালেদা জিয়া এমন একপর্যায়ে গিয়েছেন, বলতে পারেন আওয়ামী লীগ একাত্তরে গণহত্যা চালিয়েছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাও আওয়ামী লীগ করেছে—এমন কথা বলতে পারেন। জাতীয় পতাকা, সংবিধান, স্বাধীনতার প্রতিও তার ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ নেই। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে বিপন্ন করতে খালেদা জিয়া নৈরাজ্যের পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি দেশের শান্তি বিনষ্ট করছেন, হরতালের নামে মানুষ হত্যা করছেন। আগামী নির্বাচনেও দেশের মানুষ খালেদা জিয়াকে চিরতরে প্রত্যাখ্যান করে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবে।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, খালেদা জিয়া তার কথা রাখেননি। তিনি দু’দিনের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ না নিলে ৬০ ঘণ্টার হরতাল করবেন বলে সমাবেশে বলেছিলেন। কিন্তু একদিনের মধ্যেই বিরোধী দলের নেতাকে ফোন করে সংলাপে বসার আহ্বান জানালেন প্রধানমন্ত্রী। দেশবাসীর কাছে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, সমঝোতার উদ্যোগ গ্রহণের পরও বিরোধী দলের নেত্রী কেন হরতাল দিয়ে মানুষ হত্যা করছেন? দেশ ও জাতির প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ থাকলে বিরোধীদলীয় নেত্রী প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিতেন। যখনই প্রধানমন্ত্রী সংলাপের উদ্যোগ নেন, তখনই খালেদা জিয়া আল্টিমেটাম দিয়ে নস্যাত্ করে দেন। ২৭ তারিখ থেকে সরকার অবৈধ হলে এখন সরকার কে? তিনি (খালেদা জিয়া) কী অন্য কাউকে দাওয়াত দিচ্ছেন, গণতন্ত্র হত্যার ষড়যন্ত্র করছেন?
দফতরবিহীন মন্ত্রী ও প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সাংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ ব্যাখ্যা করে বলেন, বিরোধীদলীয় নেত্রী সংবিধান ও আইনের ঊর্ধ্বে নন। আইন মেনেই তিনি চলবেন বলে শপথও নিয়েছেন। অথচ তিনি প্রতিদিনই সংবিধান, আইন ও শপথ ভঙ্গ করে চলেছেন। কোন আইনে সরকার অবৈধ হয়েছে, তার ব্যাখ্যা জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্য বিরোধীদলীয় নেত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া সমঝোতা চান না, নৈরাজ্য চান। অবৈধভাবে হরতাল ডেকে খালেদা জিয়া ১১ জন মানুষকে হত্যা করেছেন। এর দায়-দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে।
তিনি বলেন, দেশ ও জাতির স্বার্থে রাজনৈতিক ৪২ বছরের ইতিহাস ভঙ্গ করে প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেত্রীর কাছে ফোন করেছেন। সেখানেও শালীনতা প্রদর্শন করেননি খালেদা জিয়া। নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নিলেই রাষ্ট্র, সরকার কিংবা সংসদ অবৈধ হয়ে যায় না। ক্ষমতা পরিবর্তনের একটিই পথ, তা হলো নির্বাচন। আরেকটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করা পর্যন্ত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও সরকার বৈধ। সরকারকে অবৈধ বলে খালেদা জিয়া ‘রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ ও সংবিধান লঙ্ঘন’ করেছেন। সরকার অবৈধ হলে সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারাও অবৈধ হয়ে যাবে, বেতন-ভাতা কী বিরোধীদলীয় নেত্রী দেবেন? আপনি দেশে কী করতে চান? স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে ধ্বংস করতে চান, জবাব পাবেন। আগুন নিয়ে খেলবেন না। ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড করতে চান, সরকার অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে। বিএনপিকে চালাচ্ছে জামায়াত, খালেদা জিয়াও চলছেন এই স্বাধীনতাবিরোধী দলটির ইশারায়।
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, একাত্তরের অস্তিত্ব থাকবে কি থাকবে না, জাতির সামনে এখন সেই প্রশ্নই উপস্থিত। গত ২৪ অক্টোবর বিরোধীদলীয় নেত্রী বলেছেন, ২৫ অক্টোবর থেকে এই সরকার অবৈধ। আবার পরে বলেছেন ২৭ তারিখ থেকে সরকার অবৈধ, প্রশাসন যেন সরকারের কথা না শোনে। নকল জন্মদিন দেখেই বোঝা যায় তার তারিখ বিভ্রাট ঘটেই যাচ্ছে। বিরোধীদলীয় নেতার সব সুযোগ-সুবিধা নেয়ার পরও খালেদা জিয়ার বর্তমান সরকারকে অবৈধ বলা সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক।
তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী আগামী ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সরকার বৈধ। সরকারকে অবৈধ বলে আসলে বিরোধী দলের নেতা সংবিধান, আইন ও নিজেকেই অস্বীকার করছেন। এই অস্বীকারের মধ্য দিয়ে তিনি আসলে কী চাচ্ছেন? আসলে তিনি সংবিধানের বাইরে অসাংবিধানিক সরকার বহাল করতে চাচ্ছেন। পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে সারাদেশে পরিকল্পিত নৈরাজ্য চালাচ্ছেন। ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দীতে যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দাবি করে খালেদা জিয়া পবিত্র স্থানটিকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেছেন। শুধু পুলিশের ওপর তারা আক্রমণ করছেন না, আদালত-বিচারপতি, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বাসার সামনে বোমা মারছে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যারা কথা বলে সেই সংবাদপত্রের অফিসে বোমা হামলা করছে। তিনি বলেন, জাতি আশা করেছিল বিরোধীদলীয় নেতা সংলাপে সাড়া দেবেন। আসলে জামায়াতের পরামর্শ ছাড়া খালেদা জিয়া চলতে পারেন না, তা আবারও প্রমাণ হয়েছে। আমরা এখনও আশাবাদী তিনি আলোচনার টেবিলে আসবেন।
সরকারি দলের সিনিয়র নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, খালেদা জিয়া যখনই আল্টিমেটাম দেন, তখনই গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে হত্যা করতে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী দেশ ও জাতির স্বার্থে বিরোধীদলীয় নেতাকে সংলাপে বসার আমন্ত্রণ জানালেন। অথচ খালেদা জিয়া হরতাল প্রত্যাখ্যান না করে জ্বালাও-পোড়াও করে মানুষ হত্যা করছেন। এমনকি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার মেনে নিলেই তিনি সংলাপে আসবেন—এমন পূর্বশর্তও জুড়ে দিয়েছেন তিনি। আসলে জামায়াত এখন খালেদা জিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে, বিএনপি চলে এখন জামায়াতের ইশারায়। সন্ত্রাসী ও জঙ্গি তত্পরতা করে এদেশকে একটি তালেবান রাষ্ট্রে পরিণত করতে চান খালেদা জিয়া। এ কারণেই এরা স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব-গণতন্ত্র-সংবিধান ও আদালতের ওপর আঘাত হানার স্পর্ধা দেখাচ্ছে। এদেশের মানুষ তা হতে দেবে না। তিনি বলেন, সরকার অবৈধ হলে অবৈধ হবে সংসদও। সরকার অবৈধ হলে রক্তস্নাত পতাকা নিয়ে খালেদা জিয়া আপনি কীভাবে ঘুরেন, আপনিও তো অবৈধ। আপনি তো স্বাধীনতাই মানেন না, আপনার তো এদেশেই থাকার কোনো অধিকার নেই। বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রতি তিনি বিশ্বাস করেন না। সরকার অবৈধ নয়, অবৈধ তো আপনি। বাংলাদেশের জন্য আপনি অবৈধ। এ দেশে থাকার কোনো অধিকার আপনার নেই।
বিরোধীদলীয় নেতার কণ্ঠ নকল করে ব্যঙ্গ করেন শেখ সেলিম। তিনি বলেন, এই সংসদ ৪০৯ দিন চলেছে। এর মধ্যে বিরোধীদলীয় নেতা ১০ দিন এসে ৭ ঘণ্টা ১১ মিনিট বক্তব্য দিয়েছেন। একদিন তিনি ১ ঘণ্টা ৫৩ মিনিট বক্তব্য দিয়েছেন। আর বেরিয়ে গিয়ে বলেন (মেয়েলি কণ্ঠে) ‘আমাদের কথা বলতে দেয়া হয় না সেজন্য বেরিয়ে এসেছি। আমাদের কথা বলতে দেয়া হয় না। আসব কেন’। শেখ সেলিমের এ বক্তব্যের সময় সংসদে উপস্থিত সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হাসতে থাকেন। এ সময় অন্য সংসদ সদস্যদেরও হাসতে দেখা যায়।

No comments:

Post a Comment