Search This Blog

Wednesday, October 23, 2013

এই ভারতীয় পাঠককে অনেক ধন্যবাদ


সি রা জু র র হ মা ন
ভারতের কোথাও থেকে জনৈক আনোয়ার হোসেন ই-মেইলে আমার গত সপ্তাহে লেখা কলামের সমালোচনা করেছেন। (anwar.hussain@rediffmail.com). তাঁর বক্তব্যের সার কথা : আমি যখন বিবিসি থেকে সম্প্রচার করতাম আমার বক্তব্য আর স্টাইলের তিনি একজন অনুরক্ত ভক্ত (ফ্যান) ছিলেন। কিন্তু এখন আমি বৃদ্ধ হয়েছি, অবসর নিয়েছি, পত্রিকার কলামে আমি যা লিখি তাঁর ভালো লাগে না। সমালোচনাগুলো তিনি মোটামুটি দুটি প্রশ্নের আকারে তুলে ধরেছেন। প্রথম : আমি কি ভারত-বিরোধী, আমি কি ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব চাই না? দ্বিতীয়ত : উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যে যারা স্বাধীন হওয়ার জন্য সংগ্রাম করছে তাদের আমি কোন বিবেচনায় মুক্তিযোদ্ধা বলছি? ইংরেজিতে লেখা ই-মেইলে আনোয়ার হোসেন একাত্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহায়তার কথা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
লেখককে অনেক ধন্যবাদ। দেখা যাচ্ছে একাত্তরে বিবিসি থেকে সম্প্রচার ছাড়াও যে আমার একটা বিশিষ্ট ভূমিকা ছিল তিনি জানতে পারেননি। তাঁর জ্ঞাতার্থে জানিয়ে দিচ্ছি যে সে সময় ব্রিটিশ এবং বিশ্ব মিডিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের প্রচার-প্রচারণার দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। বেশ কয়েকজন ভারতীয় সাংবাদিক এবং কূটনীতিকের সঙ্গে তখন আমি ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় কাজ করেছি। আমার কোনো কোনো বই পড়ে দেখলে তিনি জানতে পারতেন যে আমার স্কুলজীবন কলকাতায় কেটেছে। বিবিসির চাকরি এবং মুক্তিযুদ্ধের সুবাদে কলকাতা ও দিল্লির বহু সাংবাদিকের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। কলকাতা এবং দিল্লি ছাড়াও দার্জিলিং, চেন্নাই, মুম্বাই, হায়দরাবাদ, পুনে প্রভৃতি অনেকগুলো ভারতীয় শহরে আমি গেছি এবং বিভিন্ন শহরের বিশিষ্ট কিছু ব্যক্তির সঙ্গে আমার যোগাযোগ গড়ে উঠেছে। ভ্রমণের শক্তি-সামর্থ্য যখন ছিল প্রায়ই বাংলাদেশে গেছি এবং প্রতিবারই ভারতের কোথাও না কোথাও যেতাম, অন্তত কলকাতায় তো বটেই।
কর্মসূত্রে ভারতের বহু রাজনীতিকের সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাত্ ও পরিচয় হয়েছে। প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধী, প্রয়াত জ্যোতি বোস, প্রয়াত আবদুল গনি খান চৌধুরী, শ্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য প্রমুখরা মাত্র কয়েকজন। তাছাড়া পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সবগুলো জেলায় আমি ঘুরেছি। কলকাতার একখানি পত্রিকায় আমি বহুদিন লিখেছি; কলকাতার প্রকাশকরা আমার অন্তত চারখানি বই প্রকাশ করেছেন। আমার ভারতীয় বন্ধুদের অনেকে এখনও আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। লন্ডনে এলে আমাদের বাড়িতে বেড়াতেও আসেন কেউ কেউ। লন্ডনে যাদের সঙ্গে আমাদের ওঠা-বসা তাদেরও অনেকে ভারতীয়। আমি আশা করছি এরপর আনোয়ার হোসেন ভারত-বিরোধিতা কিংবা ভারত-বিদ্বেষের অপবাদ আমাকে দেবেন না।
এরপর কৃতজ্ঞতার প্রশ্ন। একাত্তরে ভারত প্রায় এক কোটি বাংলাদেশী শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল। ভারত আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের কাউকে কাউকে অস্ত্র এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে সাহায্য করেছে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের কূটনৈতিক সাহায্য-সমর্থন দিয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে একাত্তরের ৩ ডিসেম্বর আমাদের স্বাধীনতা ত্বরান্বিত করার জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যও নামিয়েছিল। বাংলাদেশের যে কোনো মানুষকে জিজ্ঞেস করুন, আজও পর্যন্ত তারা সেসব বাবত ভারতের কাছে কৃতজ্ঞ।
কিন্তু কৃতজ্ঞতা সর্বব্যাপী কিংবা চিরস্থায়ী নয়। কৃতজ্ঞতাকে লালন করতে হয়। এবং কৃতজ্ঞতার সীমা-পরিসীমাও থাকা দরকার। ভুলে গেলে চলবে না যে, ভারত বরাবরই পাকিস্তান ভাঙতে চেয়েছে। সে হিসেবে আমরা মুক্তিযুদ্ধ শুরু করে ভারতকে অপরিসীম অনুগ্রহ করেছি। অনেকগুলো কারণের মধ্যে বড়টি ছিল প্রতিরক্ষার বিবেচনা। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে দুই সীমান্তে ভারতকে বছরের ৩৬৫ দিনই প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি বহাল রাখতে হতো, তাতে তার বার্ষিক বহু বিলিয়ন (শত শত কোটি) ডলার ব্যয় করতে হতো। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় সে ব্যয় রাতারাতি অর্ধেক হয়ে গেল ভারতের জন্য।
তাছাড়া একাত্তরে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনার একটা অত্যাধুনিক বাহিনীর ফেলে যাওয়া সব সমরাস্ত্রই ভারত নিয়ে গেছে শত শত ত্রিপল-ঢাকা ভারী ট্রাক বোঝাই করে। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে কলকাতার এক সাংবাদিক বন্ধু রসিকতা করে বলেছিলেন, ভারত সবচাইতে বেশি সামরিক সাহায্য পায় পাকিস্তানের কাছ থেকে। কিন্তু এখনও দেখা যাচ্ছে যখনই বাংলাদেশ থেকে ভারত কিছু পেতে চায় তখনই কোনো না কোনো ভারতীয় মহল সে কৃতজ্ঞতার প্রশ্ন তোলে। বস্তুত সীমান্তের ওপারে এটা একটা বদঅভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

ভারতের সঙ্গে চুক্তি নির্ভরযোগ্য নয়
বন্ধুত্ব অবশ্যই বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের কাম্য। জনসংখ্যা বিশাল হলেও আয়তনে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র দেশ এবং তিন দিকেই ভারতের দ্বারা পরিবেষ্টিত। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছাড়া বাংলাদেশের উন্নতি, সুখ ও সমৃদ্ধি সম্ভব নয়। অথচ আমাদের স্বাধীনতা কামনা ও মুক্তিযুদ্ধের সেটাই ছিল মূল লক্ষ্য। কিন্তু মনে রাখতে হবে চাকরে-মুনিবে বন্ধুত্ব হয় না। বন্ধুত্বের প্রথম ও প্রধান শর্ত পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। দুর্ভাগ্যবশত সে শ্রদ্ধাবোধ ভারতের দিক থেকে আমরা দেখিনি। কতগুলো চুক্তির দৃষ্টান্তই যথেষ্ট হবে আশা করি। ১৯৭৪ সালে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী আর শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে সীমান্ত সহজীকরণ চুক্তি হয়েছিল। শেখ মুজিব কালবিলম্ব না করেই বাংলাদেশ সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী পাস করেন এবং সে অনুযায়ী বেরুবাড়ী ছিটমহলটি ভারতের কাছে তাত্ক্ষণিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। ৩৯ বছর পরে আজ অবধি চুক্তি অনুযায়ী তিন বিঘা ছিটমহলটি বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সফরে আসেন। সে সময় ঢাক-ঢোল পিটিয়ে প্রচার করা হয়েছিল যে তিনি ঢাকায় তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিতে সই করবেন। সে চুক্তি আজ অবধি স্বাক্ষরিত হয়নি। শেখ হাসিনা প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার সঙ্গে ফারাক্কায় গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। কিন্তু যে কোনো বিশেষজ্ঞ আপনাকে বলে দেবে সে চুক্তি অনুযায়ী পানি বাংলাদেশ কোনো বছরই পায়নি। দেখা যাচ্ছে দুদেশের মধ্যেকার চুক্তিগুলো বাংলাদেশই মেনে চলে, ভারত নয়। সীমান্ত ও তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে ভারত সরকারের কৈফিয়ত, ভারতের লোকসভায় চুক্তিদুটো অনুমোদনে অসুবিধা সৃষ্টি হয়েছে।
শেখ হাসিনা ২০১০ সালের জানুয়ারিতে দিল্লিতে গিয়ে ভারতের সঙ্গে কতকগুলো গোপন চুক্তি করে এসেছিলেন। সেসব চুক্তির বিবরণ, এমনকি সংখ্যাও বাংলাদেশের মানুষ আজও জানতে পারেনি। চুক্তিগুলো সংসদেও উত্থাপন করা হয়নি। অথচ আমরা দেখেছি এশিয়ান হাইওয়ের গতি পরিবর্তন করে দুই ধারায় সে মহাসড়ক ভারত থেকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে আবার ভারতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের জনবিচ্ছিন্ন সরকার কোনো প্রকার শুল্ক কিংবা মাশুল ছাড়াই সড়ক, রেল ও নদীপথে ভারতকে করিডোর এবং ট্রানজিট দিয়ে দিয়েছে, বিনা শুল্কে বাংলাদেশের দুটি সামুদ্রিক বন্দরও ভারতের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে।

গোপন চুক্তি সম্বন্ধে চ্যালেঞ্জ হবেই
এখন আবার বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের ভারী ট্রাকগুলোর অবাধ চলাচলের অধিকার দেয়া হচ্ছে। তাও বিনা শুল্কে। অর্থাত্ ভারত এখন বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক সাহায্য পাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। ভারতের প্রতি শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের এসব উদারতা ও দানশীলতা ভবিষ্যতে দু’দেশের সম্পর্কে জটিল সমস্যা-সঙ্কট সৃষ্টি করতে বাধ্য, কেননা বাংলাদেশ সংসদে অনুমোদিত হয়নি বলে এসব চুক্তি স্পষ্টতই অবৈধ। এ চুক্তিগুলোর প্রতি কোনো না কোনোদিন আইনের চ্যালেঞ্জ উঠবেই এবং বাংলাদেশে প্রতিনিধিত্বশীল সংসদ নির্বাচিত হলে সে সংসদও এসব গোপন চুক্তি এবং সেসব চুক্তির ব্যবহারকে চ্যালেঞ্জ করবে। তাতে দু’দেশের সম্পর্কে তিক্ততা সৃষ্টি হবেই।
সবাই জানে, বাংলাদেশ পলিমাটি আর বর্ষা-বন্যার দেশ। এদেশের সড়ক ও রেল সড়ক খুবই দুর্বল এবং প্রতি বন্যায় সেসব সড়কের ভারী ক্ষতি হয়। অবকাঠামো মেরামত বাংলাদেশ বাজেটের ওপর ভারি চাপ সৃষ্টি করে। ভারতের ভারী ট্রাক চলাচলের ফলে সড়ক সেতু ইত্যাদির যে সমূহ ক্ষতি হবে সেটা বাংলাদেশকে বহন করতে বলা নির্লজ্জ শোষণ ছাড়া আর কিছুই নয়। ত্রিপুরা রাজ্যে বিদ্যুত্ উত্পাদন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য অত্যধিক ভারী ও প্রশস্ত যন্ত্রপাতি বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাতে পরিবেশের যা ক্ষতি হয়েছে সেটা পূরণ হতে আরও দীর্ঘকাল সময় নেবে এবং তার খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশের দরিদ্র কৃষকদের।
আশা করি ভারতের পাঠক আনোয়ার হোসেনকে মনে করিয়ে দিতে হবে না যে, টাটা কোম্পানি হলদিয়ার কাছে মেদিনীপুরে মোটরগাড়ির কারখানা তৈরির পরিকল্পনা করার পরে সে এলাকার মানুষ পরিবেশ বাঁচানোর দাবিতে বছরের পর বছর কেমন তীব্র প্রতিবাদ করেছিল। তখনকার মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও তার সরকারের সর্বপ্রকার চেষ্টা সত্ত্বেও সে কারখানা তৈরি সম্ভব হয়নি। টাটা সে কারখানা অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। সে প্রকল্পের অনুপাতে বাংলাদেশের সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে রামপাল নামক স্থানে দু’দেশের যৌথ মালিকানায় কয়লা জ্বালানো বিদ্যুত্ উত্পাদন কারখানা তৈরির পরিবেশগত বিপদ বহুগুণে বেশি।
কয়লা-নিঃসৃত বিদূষণ সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যটির মারাত্মক ক্ষতি করবে, রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাংলাদেশ থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে। শুধু স্থানীয় নয়, বাংলাদেশের সব অঞ্চলের মানুষের আপত্তি সত্ত্বেও ভারত সরকার তাদের অনুগত হাসিনা সরকারকে দ্রুত কারখানাটি নির্মাণের জন্য চাপ দিচ্ছে। বিরোধী দলের নেতা বেগম খালেদা জিয়া ঘোষণা করেছেন যে রামপালে সে কারখানা হতে দেয়া হবে না। বেগম জিয়া যথার্থই বাংলাদেশের সব মানুষের অভিমতের প্রতিধ্বনি করেছেন।
কথায় ও কাজে বিরাট ব্যবধান
ভারতের মন্ত্রীরা বলছেন বাংলাদেশের পরিবেশের যাতে ক্ষতি না হয় সেদিকে তারা খেয়াল রাখবেন। বাস্তবতার আলোকে বাংলাদেশের মানুষ তাদের আশ্বাসকে বিশ্বাস করতে পারছে না। বাংলাদেশের অভিন্ন নদীগুলোর উজানে ভারত অন্তত ৫৩টি বাঁধ তৈরি করেছে আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে। বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আনোয়ার হোসেন খরার মৌসুমে বাংলাদেশে এলে সেসব নদীর খাদ দিয়ে গরুর গাড়িতে চলাফেরা করতে পারবেন ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে। নদীখাত শুকিয়ে গেছে বলে বর্ষার পানি নদীগুলো ধরে রাখতে পারছে না। ভয়াবহ বন্যা বাংলাদেশে এখন বার্ষিক দুর্যোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পলি পড়ে নদীর মোহনা উঁচু হয়ে গেছে বলে বন্যার পানি সমুদ্রে নেমে যেতে অনেক বেশি সময় নিচ্ছে। তাতে বাংলাদেশের ভেতরে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হচ্ছে। এখন আবার ভারত টিপাইমুখে বরাক নদীতে বাঁধ তৈরি করছে। এ বাঁধ তৈরি হয়ে গেলে সুরমা, কুশিয়ারা ও মেঘনা নদীও পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর মতো শুকিয়ে যাবে। বাংলাদেশের পূর্বার্ধ মরুভূমি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে।
বাংলাদেশের মানুষদের প্রতি ভারতের অবন্ধুসুলভ আচরণের প্রধান দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে দিল্লির অন্যায় হস্তক্ষেপ। বাংলাদেশের মানুষ শেখ হাসিনার সরকারকে আর গদিতে দেখতে চায় না। কিন্তু দিল্লি তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে পদদলিত করছে জবরদস্তি শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রীর আসনে অধিষ্ঠিত রাখার চেষ্টা করে। বাংলাদেশের মানুষ ভারতের অভিসন্ধি ঠিকই বোঝে। ভারত হাসিনাকে দিয়ে একের পর এক তাদের স্বার্থ উদ্ধার করে নিতে চায়। এমনকি ভারত যদি সিকিমের মতো বাংলাদেশকে গ্রাস করতে চায় তাহলে শেখ হাসিনাই হচ্ছেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি তাতে রাজি হবেন। বস্তুত বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মানুষ ভয় করে, সেটাই ভারতের প্রকৃত উদ্দেশ্য। ভারতের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ক্রোধের এটাই হচ্ছে কারণ।
এসব কিছুতেই বাংলাদেশের মানুষের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ হতে পারে না। বাংলাদেশের মানুষের প্রতি ভারতের অবন্ধুসুলভ আচরণের আরও কিছু নমুনা হচ্ছে সীমান্তের লাগোয়া ক্রমেই বেশি সংখ্যায় বিষাক্ত মাদক ফেনসিডিল ও ইয়াবা তৈরির কারখানা নির্মাণ। লক্ষণীয় যে এই মাদকগুলো নিয়ে ভারতের নিজের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তার দেশে বহু ব্রুয়ারিতে বিয়ার তৈরি হয়। যারা নেশা করতে চায় তারা সস্তায় বিয়ার পান করে, ফেনসিডিল কিংবা ইয়াবা সেবন করে না। অন্যদিকে মাদক সেবন এরই মধ্যে বাংলাদেশে মহা সঙ্কট হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম এসব মাদকের প্রভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে।

মুক্তিযোদ্ধা কে এবং কারা
পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যা দেখা দিয়েছিল তাদের অবন্ধুসুলভ আচরণ ও নির্লজ্জ শোষণের কারণে। সত্ ও সাধুভাবে সঙ্কট নিরসনের পরিবর্তে পাকিস্তানিরা অস্ত্রবলে আমাদের ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের দাবি বরাবরের জন্য স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল এবং ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য দেয়ার আড়ালে তার বরাবরের স্বপ্ন সফল করে পাকিস্তানকে দু’টুকরো করে দিয়েছিল। এ হচ্ছে ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত। পাকিস্তানিদের শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমাদের অস্ত্র ধারণের সমালোচনা ভারতে কোথাও হয়েছিল বলে শুনিনি। একবাক্যে সবাই বাংলাদেশীদের মুক্তিযোদ্ধা বলে অভিনন্দিত করেছিল।
পাঠক আনোয়ার হোসেন অবশ্যই স্বীকার করবেন ভারতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হয়েছে মূলত তামিলনাড়ু, কেরালা, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, হরিয়ানা ও পাঞ্জাব প্রভৃতি পশ্চিমের রাজ্যগুলোতে। সে অনুপাতে মধ্যপ্রদেশ থেকে শুরু করে বিহার, উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গ গুরুতর রকম অবহেলিত। এ রাজ্যগুলোতে অসন্তোষ প্রায়ই বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহের রূপ নিচ্ছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত বোন নামে পরিচিত সাতটি রাজ্য প্রায় ৫০ বছর ধরে অভিযোগ করে আসছে, মূল্যবান কাঠ, তেল ও গ্যাস দিয়ে তারা ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রচুর অবদান রাখছে; কিন্তু সে অনুপাতে তারা খুবই অবহেলিত। তাদের অসন্তোষ অবশেষে চার দশকেরও বেশি আগে সশস্ত্র বিদ্রোহের রূপ নিয়েছে। তারা ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন হতে চায়। তাদের ধারণায় ভারতের অবশিষ্ট অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হলে তারা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে।
দুর্ভাগ্যবশত এই গোটা সময়টা জুড়ে ভারতের বিভিন্ন সরকার ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে সাত বোনের অসন্তোষ দূর করার চেষ্টা না করে অস্ত্রবলে তাদের বিদ্রোহ দলনের চেষ্টা চালিয়েছে। অর্থাত্ পাকিস্তানিরা যে ভুল করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারও সে একই ভুল করে চলেছে। এই রাজ্যগুলোর সশস্ত্র বিদ্রোহীদের কী বলে বর্ণনা করব? যারা স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য যুদ্ধ করে তারা অবশ্যই মুক্তিযোদ্ধা। একাত্তরের বাংলাদেশীরা মুক্তিযোদ্ধা হলে এরা মুক্তিযোদ্ধা কেন নয়?
উন্মুক্ত মনে আমার বক্তব্যগুলো বিবেচনা করলে আনোয়ার হোসেন তার প্রশ্ন ও সমালোচনার সদুত্তর পাবেন। তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। তাছাড়া ভারতে আমার বন্ধুরাও আমার দৃষ্টিভঙ্গি এবং অবস্থানের কার্যকারণ বুঝতে পারবেন আশা করি। সে সুযোগ দেয়ার জন্য আনোয়ার হোসেনকে ধন্যবাদ।
(লন্ডন, ১৮.১০.১৩)
serajurrahman34@gmail.com

No comments:

Post a Comment