Search This Blog

Tuesday, August 30, 2016

যুদ্ধাপরাধী পুনর্বাসনকারীদেরও বিচার হওয়া উচিৎ: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'যুদ্ধাপরাধীদের যারা পুনর্বাসন করেছেন, মন্ত্রী-উপদেষ্টা বানিয়েছেন, তাদেরও বিচার হওয়া উচিৎ। তাদের শাস্তি কী হবে, সেটিও দেশবাসীকে ভাবতে হবে। তাদের বিচার প্রকাশ্যে জনগণের সামনে হতে হবে। সেই বিচার প্রশ্নে জনমত গড়ে তুলতে হবে। আর যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে যারা সোচ্চার, রাজাকারের দোসর হিসেবে তাদের বিচারও জনগণ একদিন করবে।'
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্নস্থানে নিহত জঙ্গিদের পরিচয় নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে দেওয়া বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেছেন, 'যেসব জঙ্গি মারা যাচ্ছে, তাদের জন্য খালেদা জিয়ার এত মায়াকান্না কেন? বিএনপি নেত্রী বলেছেন, জঙ্গিদের বাঁচিয়ে রেখে শিকড়ের সন্ধান কেন করা হচ্ছে না? তার এই বক্তব্যের পর শিকড়ের সন্ধান করার আর প্রয়োজন পড়ে না। তিনিই যে জঙ্গিদের মূল শিকড়, সেটিও জনগণ জানে। এদেরও রেহাই নেই।'
মঙ্গলবার রাজধানীর খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।



তিনি আরও বলেন, জঙ্গিদের পক্ষ নিয়ে খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘এদের মারা হলো কেন? বাঁচিয়ে রাখা হলো না কেন?’ এদের বাঁচিয়ে রাখা হলে খালেদা জিয়া কী তাদের পূজা দেবেন- এটিই আমার প্রশ্ন।

শেখ হাসিনা বলেন, 'জঙ্গিদের বাঁচিয়ে রেখে জঙ্গিদের শিকড় খুঁজে বের করার কথাও খালেদা জিয়া বলেছেন। তার এ বক্তব্যের পর আর শিকড়ের সন্ধান করার প্রয়োজন হয় না। যিনি নিজেই জঙ্গিদের মদদ দেন, তখন সেখানেই যে শিকড় রয়েছে- সেটি আর খুঁজে দেখা লাগে না। শিকড় সেখানেই কী-না, সেটিও তদন্ত করতে হবে। আর শিকড়ের সন্ধানে আর যেতে হবে না। কেননা এখন শিকড় নিজেই কথা বলছেন।'

দেশকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদমুক্ত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।

চলমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায় কার্যকর অব্যাহত থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, 'জাতির দাবি ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। আমরা সেটা শুরু করেছি। অনেক হুমকি-ধামকি পেয়েছি। কিন্তু আমি একটা জিনিস মনে রেখেছি আমি জাতির পিতার কন্যা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যে বিচারের কাজে হাত দিয়েছেন, শত হুমকি-ধামকি আসলেও আমি সে কাজ থেকে পিছপা হব না। সব কিছু মোকাবেলা করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে, রায়ও হচ্ছে। সেই রায় বাস্তবায়নও করছি। একেকটি বিচারের রায় কার্যকর হচ্ছে আর জাতি শ্বাস ফেলে বাঁচছে। দেশ অভিশাপের কবল থেকে মুক্ত হচ্ছে।'

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ায় সন্তুষ্টি প্রকাশের পাশাপাশি যুদ্ধাপরাদীদের পক্ষাবলম্বনকারীদের ভূমিকারও কঠোর সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, 'লাখো শহীদের রক্ত যারা নিয়েছে, এদেশে যারা গণহত্যা চালিয়েছে, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া তাদের হাতেই জাতীয় পতাকা তুলে দেন। মন্ত্রী বানান। অপরাধ যে করে আর যে সহে, তারা সমান অপরাধী। জানি না আমাদের দেশের জ্ঞানী-গুনীরা সেটা বিশ্বাস করেন কিনা এবং বলেন কিনা। আর এখনও সেই অপরাধীদের পক্ষেই তারা সোচ্চার।'

এ প্রসঙ্গে পঁচাত্তর পরবর্তী জিয়াউর রহমানের শাসনামল এবং ২০০১-২০০৬ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার শাসনামলে যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন ও মন্ত্রী-উপদেষ্টা করার বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, 'পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে গণহত্যায় জড়িত যুদ্ধাপরাধীদের পুর্নবহাল ও পুর্নবাসন করেছেন। জেলখানায় বন্দি থাকা যুদ্ধাপরাধীদের মুক্ত করে দেন এবং যারা পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে পাকিস্তানে চলে গিয়েছিল, তাদের পাকিস্তানি পাসপোর্ট দিয়েই বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনেন জিয়া। যুদ্ধাপরাধী শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী বানান। আবদুল আলিম যে নাকি জয়পুরহাটে এক সঙ্গে ১৫৭ জনকে হত্যা করেছেন, তাকেও মন্ত্রী বানিয়েছেন তিনি। পাকিস্তানি পাসপোর্ট দিয়ে গোলাম আযমকে ফিরিয়ে এনেছেন। তার স্ত্রী খালেদা জিয়া গোলাম আযমকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দিয়ে নাগরিকত্ব দিয়েছেন। আরেক যুদ্ধাপরাধী আবদুল মান্নানকে জিয়াউর রহমান তার উপদেষ্টা বানিয়েছেন।'

তিনি বলেন, 'জিয়াউর রহমান নামে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। একখানা খেতাবও পেয়েছেন। কিন্তু কাজ কি করেছেন? দেশের স্বাধীনতাবিরোধী ও গণহত্যার সঙ্গে জড়িত যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়েছেন, পুনর্বাসন করেছেন। সংবিধান পরিবর্তন করে জামায়াতকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছেন, তাদের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাহলে তিনি কীভাবে কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা হন? তিনি কীভাবে স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন?'

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, 'একজন আইনজীবী কিভাবে এসব যুদ্ধাপরাধীর পক্ষে দাঁড়ান, বুঝতে পারি না। টাকাই কি সব? আবার তারাই বলে সরকার পরিবর্তন হলে নাকি ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু তারা দেশের জনগণকে চেনেন না। যারা এ কথা বলেন তাদেরও ব্যবস্থা জনগণই নেবে। রাজাকারের দোসর হিসাবে তাদেরও বিচার হবে। এটিও তাদের মনে রাখা উচিত।'

বক্তব্যের শুরুতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিয়োগান্তক ঘটনা তুলে ধরতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী। বারবার অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন তিনি। এতে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত সবাইকেও চোখ মুছতে দেখা যায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, '১৫ আগস্ট জাতির জীবনে একটি কলঙ্কময় দিন। মানুষ একটা শোক সইতে পারে না। আর আমি এতগুলো স্বজন হারালাম। আমি আর আমার বোন রেহানা হঠাৎ করে বিদেশে বসে জানতে পারলাম আমাদের কেউ নাই।'

শেখ হাসিনা বলেন, 'আমার কাছে কেউ বিচার চাইতে এলে ১৫ আগস্টের ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়। কেউ কি আমাদের কথা ভাবেন! কেউ যখন বিচার চায় আমার মনে পড়ে আমরা তো বিচার চাইতে পারতাম না। ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। পরে রায়ও কার্যকর হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। জাতির বুকে যে অপরাধবোধ ছিল, সেটি কেটে গেছে।'

প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমার রাজনীতি করার লক্ষ্য বাবার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলা। গরীব-দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। সেই প্রতিজ্ঞা নিয়ে ১৯৮১ সালে বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে আসি। সকল শোক-দুঃখ বুকে চাপা দিয়ে জাতির পিতার লক্ষ্য পূরণে কাজ করে যাচ্ছি। বাংলার মাটিতে বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, তাদের অন্ন, বস্ত্র বাসস্থান নিশ্চিত করা, শিক্ষার ব্যবস্থা করা। আমি তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে কাজ করছি।'

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসনাতের সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য রাখেন অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, এ কে এম রহমতউল্লাহ, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, আসাদুজ্জামান খান কামাল, মোহাম্মদ সাঈদ খোকন, শাহে আলম মুরাদ, সাদেক খান, হেদায়েতুল ইসলাম স্বপন প্রমুখ।

No comments:

Post a Comment