\সুন্দরবনকে বলা হয় জোয়ার-অরণ্য (Tidal forest)। সাধারণ বাংলায় বলা হয় বাদার
বন। বাদা শব্দটির মানে জলাভূমি। বাদার বনে জোয়ারের সময় সমুদ্র থেকে প্রচুর
নোনাপানি এসে ঢোকে; যা ভাটার সময় নেমে যায়। তাই বাদার বনে থাকে প্রচুর
লবণাক্ত কাদা। সাধারণ গাছ এ অবস্থায় বাঁচতে পারে না। বাদার বনের গাছে তাই
দেখা যায় কতগুলো দৈহিক বৈশিষ্ট্য; যা তাদের ওই নোনা কাদামাটিতে বেঁচে থাকতে
সাহায্য করে। নোনা কাদামাটির মধ্যে অক্সিজেনের অভাব থাকে।
বাদার বনের গাছে মাটির মধ্যে থাকা কিছু শিকড় থেকে শাখা শিকড় নির্গত হয়ে মাটির ওপরে উঠে আসে। এসব মূলকে বলা হয় শ্বাসমূল। কারণ এসব মূলের ছিদ্রের মধ্য দিয়ে অক্সিজেনসহ বাতাস এসব গাছের দেহে প্রবেশ করতে পারে। বাদার বনের গাছের কাণ্ড থেকে একরকম শিকড় নির্গত হয়; যাকে বলে বিশেষ ধরনের ঠেসমূল (Stilt root); যা কাদামাটিতে গাছকে খাড়াভাবে থাকতে সাহায্য করে। বাদার বনের অনেক গাছের (সব গাছের নয়) ফল, গাছের সাথে লেগে থাকার সময় বীজ অঙ্কুরিত হয়। অঙ্কুরের শিকড় ফল ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসে। এরপর ফল যখন গাছ থেকে পড়ে, তখন অঙ্কুরসহ ফল কাদামাটির মধ্যে গেঁথে যায়। এ থেকে উৎপন্ন চারাগাছ ভাটার টানে সমুদ্রে ভেসে যায় না। কাদামাটির মধ্যেই বেড়ে উঠতে সক্ষম হয়। ম্যানগ্রোভ কথাটা এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ম্যানগ্রোভ বলতে বোঝায় এমন বৃক্ষ, যারা নোনা কাদামাটিতে সমুদ্রের তীরবর্তী অঞ্চলে বেঁচে থাকতে পারে। আর গড়ে তোলে বনভূমি।
সুন্দরবনে গরান গাছ ম্যানগ্রোভের একটি আদর্শ দৃষ্টান্ত। ম্যানগ্রোভের বাংলা তাই অনেকে করেন গরানজাতীয় গাছের বন। গরানগাছ একেবারেই সমুদ্রের তীরবর্তী অঞ্চলে প্রচুর হয়। এরপর যেসব জায়গা কিছুটা কম লবণাক্ত, সেখানে হয় সুন্দরীগাছ। তার পর সুন্দরবনের উত্তর ভাগে যেখানে লবণাক্ততার পরিমাণ থাকতে দেখা যায় খুব কম, সেখানে হতে দেখা যায় সাধারণ গাছপালা। আর এককথায় মিঠাপানির গাছ। অর্থাৎ সুন্দরবনের সর্বদক্ষিণে হতে দেখা যায় গরানজাতীয় গাছ। তার পর উত্তর দিকের মধ্য ভাগে হতে দেখা যায় সুন্দরীগাছ। এরপর উত্তর দিকে দেখা যায় সাধারণ মিঠাপানির গাছপালা। এ হলো সুন্দরবনের উদ্ভিদবিন্যাসের সাধারণ ছক। সুন্দরবনে খুব বড় বৃক্ষ হয় না। সুন্দরবনের বৃক্ষ হলো মাঝারি আকৃতির। অথবা ঝোপজাতীয়। সুন্দরবনের গাছ থেকে পাওয়া যায় খুব উন্নতমানের কাঠ; যা দিয়ে ভালো আসবাবপত্র বানানো যায়। সুন্দরবন থেকে পাওয়া যায় প্রচুর জ্বালানি কাঠ। গরানজাতীয় গাছের ছালে থাকে প্রচুর ট্যানিন (Tannin)। ট্যানিন দিয়ে চামড়া ট্যান করা হয়। যাকে বাংলায় বলে, চামড়া পাকা করা। ট্যানের চামড়ার মধ্যে জিলোটিন-জাতীয় নরম প্রোটিন বস্তুর সাথে একত্র হয়ে শক্তবস্তুতে পরিণত হয়। ফলে চামড়া শক্ত হয়। সহজে ছিঁড়ে না। একে বলে চামড়া পাকা করা। সুন্দরবনের গাছপালায় প্রচুর ফুল ফোটে। মৌমাছিরা ফুলের মোম দিয়ে মৌচাক বানায়। মৌচাকে ফুল থেকে এনে জড় করে মধু। সুন্দরবন আমাদের মধু ও মোমের বিরাট উৎস। অর্থাৎ সুন্দরবনর একটা উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ভূমিকা আছে আমাদের জীবনে। সুন্দরবনে নদীর ধারে একরকম গাছ হয়, যাকে বলে গোলপাতা। গোলপাতা আসলে কিন্তু গোল নয়। গোলপাতা হলো নারকেলগাছের পাতার মতো। গোলপাতা দিয়ে ছাওয়া হয় দক্ষিণবঙ্গে কুঁড়েঘর। সুন্দরবনে খেজুরগাছের মতো একরকম গাছ হয়, যাকে বলে হিনতাল। হিনতালগাছ খেজুরগাছের মতো বড় না। কিন্তু হিনতাল গাছের পাতা দিয়ে মাদুর বোনা হয়। হিনতালের কাণ্ড ব্যবহার করা হয় কুঁড়েঘরের খুঁটি হিসেবে। এ ছাড়া হিনতালের লাঠি যথেষ্ট বানানো হয়। যার ওপর ভর দিয়ে চলাফেরা করতে পারেন বৃদ্ধরা।
সুন্দরবনের সুন্দরীগাছের কাঠকে অল্প বাতাসে পুড়িয়ে ভালো কাঠকয়লা পাওয়া যায়। এই কাঠকয়লার গুঁড়ো দিয়ে বারুদ বানানো চলে। তবে এখন সুন্দরীগাছের এক রকম রোগ হচ্ছে, যাতে অনেক সুন্দরীগাছ মরে যাচ্ছে। সুন্দরীগাছ সংরক্ষণ তাই হয়ে উঠেছে বিশেষ প্রয়োজনীয়। কাঠকয়লা আরও অনেক গাছ থেকেই কিছু কিছু হতে পারে। কাঠকয়লা হলো বিশেষ বনজসম্পদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গ্যাসমাস্ক তৈরিতে ব্যাপক হারে কাঠকয়লা ব্যবহার করা হয়েছিল। দুঃখজনকভাবে যুদ্ধ এখনো মানবজীবনের বিশেষ বাস্তবতা হয়ে আছে। আর তাই মানুষকে এ জন্যও নির্ভর করতে হচ্ছে বনের ওপর। মানুষের প্রয়োজন অবশ্য চিরকাল এক হয়ে থাকে না। মানুষ এক সময় বাড়ি বানিয়েছে কাঠ দিয়ে। কিন্তু এখন বানাচ্ছে সিমেন্ট কংক্রিট দিয়ে। বনের ওপর নির্ভরতা এ দিক থেকে তাই যথেষ্ট কমে গেছে। কিন্তু তবুও বন হয়ে আছে মানুষের জন্য যথেষ্ট প্রয়োজনীয়।
সুন্দরবনে গেওয়া নামে গাছ প্রচুর হয়। গেওয়াগাছের নরম কাঠ থেকে তৈরি করা যায় নিউজপ্রিন্ট। খুলনায় কাগজের কল স্থাপন করা হয়েছিল পাকিস্তান আমলে। খুলনার কাগজের কলে নিউজপ্রিন্ট তৈরি হতো। কিন্তু নিউজপ্রিন্ট তৈরির এই কারখানা ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এর একটা কারণ হলো গেওয়াগাছের যথেচ্ছ ব্যবহার। এর ফলে ঘটতে থাকে গেওয়া কাঠের অভাব। অন্য দিকে খুলনার নিউজপ্রিন্ট কারখানায় শ্রমিক ও কর্মচারীদের মজুরি ও বেতন বৃদ্ধির দাবি হয়ে ওঠে প্রবল। তাদের দাবি পূরণ করতে গিয়ে কারখানায় লাভ না হয়ে বাড়তে থাকে ক্ষতির পরিমাণ। তাই এই কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা এখন সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন করছি। কিন্তু সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের জন্য নিচ্ছি না কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা। এতে সুন্দরবন এগিয়ে চলবে ধ্বংসেরই পথে।
আজ যেখানে সুন্দরবন, একসময় সেখানে কোনো বন ছিল না। ছিল জনবসতি। যার প্রমাণ পাওয়া যায় সুন্দরবনের মাটি খুঁড়ে। সুন্দরবনের মাটি খুঁড়ে পাওয় গেছে দালানকোঠার ধ্বংসাবশেষ। পাওয়া গেছে বড় বড় গাছের গুঁড়ি; যা সুন্দরবনে এখন আর হয় না। সুন্দরবনের মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে বড় গাছের নিদর্শন। গাছগুলোর এ নিদর্শন পাওয়া গেছে খাড়া অবস্থায়। কেবল বাড়িঘরের নিদর্শন যে পাওয়া গেছে, তা নয়। পাওয়া গেছে পুষ্করিণীরও নিদর্শন। ঐতিহাসিক নলিনীকান্ত ভট্টশালীর মতে, খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে কোনো প্রাকৃতিক কারণে মাটি বসে যায়। আর এর ফলে জনপদ হয়ে যায় ধ্বংস। ধীরে ধীরে জনমানবহীন স্থানে গড়ে ওঠে সুন্দরবন। সুন্দরবন গড়ে ওঠার আর একটি তত্ত্ব প্রদান করেছেন মেজর জেন্স রেনেল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে রেনেল অত্যন্ত পরিশ্রম করে জরিপ করেন সে আমলের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি। অঙ্কন করেন তার মানচিত্র (১৭৬৪-৭৬ খ্রি)। রেনেল সুন্দরবন অঞ্চল জরিপ করার সময় ধারে কাছের বৃদ্ধ লোকদের সাথে কথা বলে এ সিদ্ধান্তে আসেন যে, সুন্দরবন অঞ্চল একসময় ছিল সমৃদ্ধ জনপদ। কিন্তু ওই অঞ্চল থেকে মানুষ পালাতে থাকে মগ জলদস্যুদের অত্যাচারে। মগরা যে কেবল ভয়াবহ লুটপাট করত, তা-ই নয়। তারা কর্মক্ষম নর-নারীকে ধরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করত দাসরূপে। এর ফলে সুন্দরবন অঞ্চল জনশূন্য হয়। আর সেখানে গড়ে ওঠে বনভূমি। কপিল ভট্টাচার্য তার বহুল পঠিত বাংলা দেশের নদ-নদী ও পরিকল্পনা নামক বইতে রেনেলের মতকে বিশেষভাবে সমর্থন জানান। তিনি বলেছেন, আগে যখন সুন্দরবন ছিল না, তখন ওই অঞ্চলে ছিল জনবসতি। সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়ে বহু মানুষ মারা যেতেন। কিন্তু তারা পালাতেন না ওই অঞ্চল ছেড়ে। গড়ে তুলতেন আবার জনপদ। আমি এসব কথা বলছি এ জন্য যে, আমাদের কিছু অধ্যাপক বলছেন, সুন্দরবন আছে হাজার হাজার বছর ধরে। কিন্তু তাদের এই উক্তির পেছনে কোনো ঐতিহাসিক সত্য আছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের একটি হিসাব অনুসারে সুন্দরবনের বর্তমান আয়তন হলো তিন হাজার ৬০০ বর্গকিলোমিটার। সুন্দরবন কেবল যে বাংলাদেশে আছে, তা নয়। ভারতের পশ্চিম বাংলায় সুন্দরবনের আয়তন হলো দুই হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার। ১৯৬৪ সালে পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত সুন্দরবনের মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে পাথরের দু’টি সূর্যদেবের মূর্তি; যা সংরক্ষিত আছে কলকাতার বিখ্যাত ভারতীয় জাদুঘরে। এর থেকেও প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে, সুন্দরবন অঞ্চলে এক সময় ছিল সমৃদ্ধ জনপদ।
সুন্দরবন এখন পত্রিকার খবর হয়ে উঠেছে বাগেরহাটের রামপালে ভারতের সহযোগিতায় তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হতে যাচ্ছে বলে। আমি ব্যক্তিগতভাবে ভারতের সহযোগিতায় এ রকম তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়বার বিপক্ষে। কারণ এর ফলে আমরা হয়ে পড়ব আরও বেশি ভারতনির্ভর; যা হয়ে উঠবে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য বিপজ্জনক। আমি রামপালের বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিরোধিতা করতে চাই রাজনৈতিক কারণে। আমাদের দেশে পরিবেশবাদীরা যেসব যুক্তি দেখাচ্ছেন, রামপালের বিদুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিপক্ষে, আমি তাদের গ্রহণযোগ্য বলে মনে করি না। কারণ কয়লা পোড়ানোর ফলে বাতাসে যদি কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বাড়ে, তবে নিকটবর্তী বনের গাছপালায় বাড়বে সালোকসংশ্লেষণের হার। বনের গাছপালা হবে আরো সতেজ। উদ্ভিদবিদ্যা এ কথায় বলে।
(লেখার বাকি অংশ আগামী সোমবার) প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট
বাদার বনের গাছে মাটির মধ্যে থাকা কিছু শিকড় থেকে শাখা শিকড় নির্গত হয়ে মাটির ওপরে উঠে আসে। এসব মূলকে বলা হয় শ্বাসমূল। কারণ এসব মূলের ছিদ্রের মধ্য দিয়ে অক্সিজেনসহ বাতাস এসব গাছের দেহে প্রবেশ করতে পারে। বাদার বনের গাছের কাণ্ড থেকে একরকম শিকড় নির্গত হয়; যাকে বলে বিশেষ ধরনের ঠেসমূল (Stilt root); যা কাদামাটিতে গাছকে খাড়াভাবে থাকতে সাহায্য করে। বাদার বনের অনেক গাছের (সব গাছের নয়) ফল, গাছের সাথে লেগে থাকার সময় বীজ অঙ্কুরিত হয়। অঙ্কুরের শিকড় ফল ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসে। এরপর ফল যখন গাছ থেকে পড়ে, তখন অঙ্কুরসহ ফল কাদামাটির মধ্যে গেঁথে যায়। এ থেকে উৎপন্ন চারাগাছ ভাটার টানে সমুদ্রে ভেসে যায় না। কাদামাটির মধ্যেই বেড়ে উঠতে সক্ষম হয়। ম্যানগ্রোভ কথাটা এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ম্যানগ্রোভ বলতে বোঝায় এমন বৃক্ষ, যারা নোনা কাদামাটিতে সমুদ্রের তীরবর্তী অঞ্চলে বেঁচে থাকতে পারে। আর গড়ে তোলে বনভূমি।
সুন্দরবনে গরান গাছ ম্যানগ্রোভের একটি আদর্শ দৃষ্টান্ত। ম্যানগ্রোভের বাংলা তাই অনেকে করেন গরানজাতীয় গাছের বন। গরানগাছ একেবারেই সমুদ্রের তীরবর্তী অঞ্চলে প্রচুর হয়। এরপর যেসব জায়গা কিছুটা কম লবণাক্ত, সেখানে হয় সুন্দরীগাছ। তার পর সুন্দরবনের উত্তর ভাগে যেখানে লবণাক্ততার পরিমাণ থাকতে দেখা যায় খুব কম, সেখানে হতে দেখা যায় সাধারণ গাছপালা। আর এককথায় মিঠাপানির গাছ। অর্থাৎ সুন্দরবনের সর্বদক্ষিণে হতে দেখা যায় গরানজাতীয় গাছ। তার পর উত্তর দিকের মধ্য ভাগে হতে দেখা যায় সুন্দরীগাছ। এরপর উত্তর দিকে দেখা যায় সাধারণ মিঠাপানির গাছপালা। এ হলো সুন্দরবনের উদ্ভিদবিন্যাসের সাধারণ ছক। সুন্দরবনে খুব বড় বৃক্ষ হয় না। সুন্দরবনের বৃক্ষ হলো মাঝারি আকৃতির। অথবা ঝোপজাতীয়। সুন্দরবনের গাছ থেকে পাওয়া যায় খুব উন্নতমানের কাঠ; যা দিয়ে ভালো আসবাবপত্র বানানো যায়। সুন্দরবন থেকে পাওয়া যায় প্রচুর জ্বালানি কাঠ। গরানজাতীয় গাছের ছালে থাকে প্রচুর ট্যানিন (Tannin)। ট্যানিন দিয়ে চামড়া ট্যান করা হয়। যাকে বাংলায় বলে, চামড়া পাকা করা। ট্যানের চামড়ার মধ্যে জিলোটিন-জাতীয় নরম প্রোটিন বস্তুর সাথে একত্র হয়ে শক্তবস্তুতে পরিণত হয়। ফলে চামড়া শক্ত হয়। সহজে ছিঁড়ে না। একে বলে চামড়া পাকা করা। সুন্দরবনের গাছপালায় প্রচুর ফুল ফোটে। মৌমাছিরা ফুলের মোম দিয়ে মৌচাক বানায়। মৌচাকে ফুল থেকে এনে জড় করে মধু। সুন্দরবন আমাদের মধু ও মোমের বিরাট উৎস। অর্থাৎ সুন্দরবনর একটা উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ভূমিকা আছে আমাদের জীবনে। সুন্দরবনে নদীর ধারে একরকম গাছ হয়, যাকে বলে গোলপাতা। গোলপাতা আসলে কিন্তু গোল নয়। গোলপাতা হলো নারকেলগাছের পাতার মতো। গোলপাতা দিয়ে ছাওয়া হয় দক্ষিণবঙ্গে কুঁড়েঘর। সুন্দরবনে খেজুরগাছের মতো একরকম গাছ হয়, যাকে বলে হিনতাল। হিনতালগাছ খেজুরগাছের মতো বড় না। কিন্তু হিনতাল গাছের পাতা দিয়ে মাদুর বোনা হয়। হিনতালের কাণ্ড ব্যবহার করা হয় কুঁড়েঘরের খুঁটি হিসেবে। এ ছাড়া হিনতালের লাঠি যথেষ্ট বানানো হয়। যার ওপর ভর দিয়ে চলাফেরা করতে পারেন বৃদ্ধরা।
সুন্দরবনের সুন্দরীগাছের কাঠকে অল্প বাতাসে পুড়িয়ে ভালো কাঠকয়লা পাওয়া যায়। এই কাঠকয়লার গুঁড়ো দিয়ে বারুদ বানানো চলে। তবে এখন সুন্দরীগাছের এক রকম রোগ হচ্ছে, যাতে অনেক সুন্দরীগাছ মরে যাচ্ছে। সুন্দরীগাছ সংরক্ষণ তাই হয়ে উঠেছে বিশেষ প্রয়োজনীয়। কাঠকয়লা আরও অনেক গাছ থেকেই কিছু কিছু হতে পারে। কাঠকয়লা হলো বিশেষ বনজসম্পদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গ্যাসমাস্ক তৈরিতে ব্যাপক হারে কাঠকয়লা ব্যবহার করা হয়েছিল। দুঃখজনকভাবে যুদ্ধ এখনো মানবজীবনের বিশেষ বাস্তবতা হয়ে আছে। আর তাই মানুষকে এ জন্যও নির্ভর করতে হচ্ছে বনের ওপর। মানুষের প্রয়োজন অবশ্য চিরকাল এক হয়ে থাকে না। মানুষ এক সময় বাড়ি বানিয়েছে কাঠ দিয়ে। কিন্তু এখন বানাচ্ছে সিমেন্ট কংক্রিট দিয়ে। বনের ওপর নির্ভরতা এ দিক থেকে তাই যথেষ্ট কমে গেছে। কিন্তু তবুও বন হয়ে আছে মানুষের জন্য যথেষ্ট প্রয়োজনীয়।
সুন্দরবনে গেওয়া নামে গাছ প্রচুর হয়। গেওয়াগাছের নরম কাঠ থেকে তৈরি করা যায় নিউজপ্রিন্ট। খুলনায় কাগজের কল স্থাপন করা হয়েছিল পাকিস্তান আমলে। খুলনার কাগজের কলে নিউজপ্রিন্ট তৈরি হতো। কিন্তু নিউজপ্রিন্ট তৈরির এই কারখানা ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এর একটা কারণ হলো গেওয়াগাছের যথেচ্ছ ব্যবহার। এর ফলে ঘটতে থাকে গেওয়া কাঠের অভাব। অন্য দিকে খুলনার নিউজপ্রিন্ট কারখানায় শ্রমিক ও কর্মচারীদের মজুরি ও বেতন বৃদ্ধির দাবি হয়ে ওঠে প্রবল। তাদের দাবি পূরণ করতে গিয়ে কারখানায় লাভ না হয়ে বাড়তে থাকে ক্ষতির পরিমাণ। তাই এই কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা এখন সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন করছি। কিন্তু সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের জন্য নিচ্ছি না কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা। এতে সুন্দরবন এগিয়ে চলবে ধ্বংসেরই পথে।
আজ যেখানে সুন্দরবন, একসময় সেখানে কোনো বন ছিল না। ছিল জনবসতি। যার প্রমাণ পাওয়া যায় সুন্দরবনের মাটি খুঁড়ে। সুন্দরবনের মাটি খুঁড়ে পাওয় গেছে দালানকোঠার ধ্বংসাবশেষ। পাওয়া গেছে বড় বড় গাছের গুঁড়ি; যা সুন্দরবনে এখন আর হয় না। সুন্দরবনের মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে বড় গাছের নিদর্শন। গাছগুলোর এ নিদর্শন পাওয়া গেছে খাড়া অবস্থায়। কেবল বাড়িঘরের নিদর্শন যে পাওয়া গেছে, তা নয়। পাওয়া গেছে পুষ্করিণীরও নিদর্শন। ঐতিহাসিক নলিনীকান্ত ভট্টশালীর মতে, খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে কোনো প্রাকৃতিক কারণে মাটি বসে যায়। আর এর ফলে জনপদ হয়ে যায় ধ্বংস। ধীরে ধীরে জনমানবহীন স্থানে গড়ে ওঠে সুন্দরবন। সুন্দরবন গড়ে ওঠার আর একটি তত্ত্ব প্রদান করেছেন মেজর জেন্স রেনেল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে রেনেল অত্যন্ত পরিশ্রম করে জরিপ করেন সে আমলের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি। অঙ্কন করেন তার মানচিত্র (১৭৬৪-৭৬ খ্রি)। রেনেল সুন্দরবন অঞ্চল জরিপ করার সময় ধারে কাছের বৃদ্ধ লোকদের সাথে কথা বলে এ সিদ্ধান্তে আসেন যে, সুন্দরবন অঞ্চল একসময় ছিল সমৃদ্ধ জনপদ। কিন্তু ওই অঞ্চল থেকে মানুষ পালাতে থাকে মগ জলদস্যুদের অত্যাচারে। মগরা যে কেবল ভয়াবহ লুটপাট করত, তা-ই নয়। তারা কর্মক্ষম নর-নারীকে ধরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করত দাসরূপে। এর ফলে সুন্দরবন অঞ্চল জনশূন্য হয়। আর সেখানে গড়ে ওঠে বনভূমি। কপিল ভট্টাচার্য তার বহুল পঠিত বাংলা দেশের নদ-নদী ও পরিকল্পনা নামক বইতে রেনেলের মতকে বিশেষভাবে সমর্থন জানান। তিনি বলেছেন, আগে যখন সুন্দরবন ছিল না, তখন ওই অঞ্চলে ছিল জনবসতি। সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়ে বহু মানুষ মারা যেতেন। কিন্তু তারা পালাতেন না ওই অঞ্চল ছেড়ে। গড়ে তুলতেন আবার জনপদ। আমি এসব কথা বলছি এ জন্য যে, আমাদের কিছু অধ্যাপক বলছেন, সুন্দরবন আছে হাজার হাজার বছর ধরে। কিন্তু তাদের এই উক্তির পেছনে কোনো ঐতিহাসিক সত্য আছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের একটি হিসাব অনুসারে সুন্দরবনের বর্তমান আয়তন হলো তিন হাজার ৬০০ বর্গকিলোমিটার। সুন্দরবন কেবল যে বাংলাদেশে আছে, তা নয়। ভারতের পশ্চিম বাংলায় সুন্দরবনের আয়তন হলো দুই হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার। ১৯৬৪ সালে পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত সুন্দরবনের মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে পাথরের দু’টি সূর্যদেবের মূর্তি; যা সংরক্ষিত আছে কলকাতার বিখ্যাত ভারতীয় জাদুঘরে। এর থেকেও প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে, সুন্দরবন অঞ্চলে এক সময় ছিল সমৃদ্ধ জনপদ।
সুন্দরবন এখন পত্রিকার খবর হয়ে উঠেছে বাগেরহাটের রামপালে ভারতের সহযোগিতায় তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হতে যাচ্ছে বলে। আমি ব্যক্তিগতভাবে ভারতের সহযোগিতায় এ রকম তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়বার বিপক্ষে। কারণ এর ফলে আমরা হয়ে পড়ব আরও বেশি ভারতনির্ভর; যা হয়ে উঠবে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য বিপজ্জনক। আমি রামপালের বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিরোধিতা করতে চাই রাজনৈতিক কারণে। আমাদের দেশে পরিবেশবাদীরা যেসব যুক্তি দেখাচ্ছেন, রামপালের বিদুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিপক্ষে, আমি তাদের গ্রহণযোগ্য বলে মনে করি না। কারণ কয়লা পোড়ানোর ফলে বাতাসে যদি কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বাড়ে, তবে নিকটবর্তী বনের গাছপালায় বাড়বে সালোকসংশ্লেষণের হার। বনের গাছপালা হবে আরো সতেজ। উদ্ভিদবিদ্যা এ কথায় বলে।
(লেখার বাকি অংশ আগামী সোমবার) প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

No comments:
Post a Comment