তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক ১০ জন উপদেষ্টা ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজনকে
সরকারের প্রধান করে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাব
দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়া বলেছেন, ১৯৯৬ ও ২০০১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২০ উপদেষ্টার মধ্য থেকে ১০ জনকে নিয়ে এ সরকার গঠন করা হবে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপি পাঁচটি করে নাম প্রস্তাব করবে। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের ঐক্যমতের ভিত্তিতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন সম্মানিত নাগরিককে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হবে। শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী শিগগিরই এ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
গতকাল বিকালে গুলশানের হোটেল ওয়েস্টিনে বহুল প্রত্যাশিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ প্রস্তাব উত্থাপন করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আশাবাদ ব্যক্ত করেন, বিপর্যয় মোকাবিলায় সক্ষম এ জাতি অচিরেই বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট থেকে মুক্তি পাবে।
তিনি বলেন, আমরা সংঘাত নয়—সমঝোতা চাই। স্বৈরশাসন নয়, গণতন্ত্র চাই। আমরা লগি-বৈঠার তাণ্ডব, গান পাউডার দিয়ে পুড়িয়ে বাসযাত্রীদের হত্যা, অফিস যাত্রীদের দিগম্বর করার কুসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। বাংলাদেশের মানুষ অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি এবং
পরিবর্তনের প্রত্যাশায় উন্মুখ হয়ে আছে। সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, আসুন আমরা সবাই তাদের সেই প্রত্যাশার প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিই।
খালেদা জিয়া তার ও পরিবারের প্রতি যারা অত্যাচার করেছেন তাদের ক্ষমা করার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, তাদের প্রতি আমার কোনো প্রতিহিংসা নেই। আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম। আমরা ক্ষমতায় গেলেও তাদের প্রতি কোনো প্রতিশোধ নেয়া হবে না।
আওয়ামী লীগের প্রচারণার জবাব দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিস্তার আওয়ামী লীগের বিগত সরকারের আমলেই ঘটেছিল।
গত শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় মন্ত্রিসভার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সরকারের জন্য বিরোধী দলের কাছে নামও চান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের তিনদিন পর সোমবার এই প্রস্তাব তুললেন বিএনপি চেয়ারপারসন।
গতকাল বিকাল ৪টা ১০ মিনিটে হোটেল ওয়েস্টিনে এই সংবাদ সম্মেলন শুরু হয়। ৪৪ মিনিট স্থায়ী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর সর্বদলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাব, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা, দেশে বর্তমান অবস্থা, ক্ষমতায় গেলে তার সরকারের করণীয় বিষয়গুলো তুলে ধরেন। শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে চারদলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে যেসব বক্তব্য রেখেছেন, সে সম্পর্কেও জবাব দেন খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার প্রস্তাবে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারের যে অস্পষ্ট ধারণা তুলে ধরেছেন তাতে সেই অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান কে হবেন তা খোলাসা করেননি। এতে নাগরিকদের মধ্যে এই সংশয় রয়ে গেছে যে, তিনি সংসদ বহাল ও নিজের হাতে ক্ষমতা এবং প্রশাসন কুক্ষিগত রেখে বিরোধী দলকে এক অসম প্রতিযোগিতায় আহ্বান জানাচ্ছেন। এটি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের গণদাবি’ সম্পর্কে কোনো আলোচনার অবকাশ না রেখে একতরফাভাবে শুধু নিজের সুবিধা অনুযায়ী একটি প্রস্তাব তুলেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে জাতি হতাশ হয়েছে মন্তব্য করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমি এখনও মনে করি, আলোচনার মাধ্যমেই বিষয়টির সুরাহা করা দরকার। এবং সেটা যত দ্রুত হয়, ততই মঙ্গল। এ লক্ষ্যেই বিএনপি ও ১৮ দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের এ প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি।
খালেদা জিয়া বলেন, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণভিত্তিক দুটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই দুটি সরকারের উপদেষ্টারা তাদের নিরপেক্ষতার জন্য সব মহলে প্রশংসিত হয়েছিলেন।
তিনি আশা করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে দু’পক্ষের মধ্যে দ্রুত আলোচনার কার্যকর উদ্যোগ নেবেন। সাংবিধানিকভাবে এই নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের জন্যও আমি তার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।
সাংবিধানিকভাবে কীভাবে এই সরকার গঠন করা যায় তারও একটি প্রস্তাব রয়েছে খালেদা জিয়ার বক্তব্যে।
বিদ্যমান সংবিধান ঠিক রাখলে সংসদ নেতার প্রতি পরামর্শ রেখে খালেদা জিয়া বলেন, আমি বলতে চাই বর্তমান সংসদ ভেঙে যাওয়ার আগে প্রয়োজনবোধে ওই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে নির্বাচিত করা যেতে পারে। সংসদ যেভাবে রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্যদের নির্বাচিত করে থাকে সেভাবেই এই উপদেষ্টাদের নির্বাচিত করা হবে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের যে দোহাই দিচ্ছেন, তা তারা নিজেরাই যথেচ্ছ রদবদল করে সঙ্কট সৃষ্টি করেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ রুদ্ধ করেছেন এবং জনগণের ভোটাধিকার হরণের সুযোগ তৈরি করেছেন। জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের কেবল নির্বাচনের তারিখ নিয়ে বিরোধী দলের পরামর্শ চেয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
প্রধানমন্ত্রী সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দেয়ার তিনদিন পর বিরোধীদলীয় নেতা তার অবস্থান পরিষ্কার করলেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের বিষয়ে খালেদা জিয়া গত দু’দিনে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি এবং ১৮ দলীয় জোট নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে জাতি হতাশ
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ জাতিকে হতাশ করেছে বলে মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, আমরা বারবার আশা করি সরকার জনগণের নির্দলীয় সরকারের দাবির প্রতি সম্মান জানাবে। কিন্তু তাদের অনড় অবস্থান, যুদ্ধংদেহী আচরণ সবাই হতাশ করেছে।
তিনি বলেন, সবার আশা ছিল ভাষণে দেশবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষার ব্যাপারে সুস্পষ্ট বক্তব্য থাকবে; কিন্তু তা না থাকায় বিরোধী রাজনৈতিক দল ও দেশবাসী হতাশ হয়েছেন।
১৮ দলের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ
খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি ও ১৮ দলীয় জোটসহ সব বিরোধী দল ও বাংলাদেশের জনগণ জাতীয় নির্বাচনকালীন একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার। আমরা শান্তিপূর্ণ পন্থায় এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছি মূলত গণসংযোগ ও প্রচারাভিযানের মাধ্যমে। আমরা আশা করেছিলাম, সরকার জনগণের দাবির প্রতি সম্মান দেখাবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশার অনুকূলে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে।
ক্ষমার ঘোষণা
জিয়া পরিবারকে যারা হেয় করেছেন, তাদের প্রতি কোনো প্রতিহিংসা নেই বলে জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, যারা অতীতে জিয়া পরিবারকে হেয় করেছেন, কুত্সা রটিয়েছেন, তাদের প্রতি আমার কোনো প্রতিহিংসা নেই। আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম। আমরা ক্ষমতায় গেলেও তাদের প্রতি কোনোপ্র্রতিশোধ নেয়া হবে না।
আওয়ামী দুঃশাসনের খণ্ডচিত্র
বিএনপি চেয়ারপারসন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের কর্মকাণ্ড তুলে ধরে বলেন, গত কয়েক বছরে একের পর এক ঘটে গেছে নানা মর্মান্তিক ঘটনা। রানা প্লাজা ধসে হাজারের বেশি শ্রমজীবী মানুষের করুণ মৃত্যু হয়েছে। এতে দেশবাসী স্তম্ভিত। এই শোচনীয় ঘটনা বিশ্ববিবেককেও নাড়িয়ে দিয়েছে।
শেয়ারবাজারের নিষ্ঠুর লুণ্ঠনে ৩৩ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী পথে বসেছে। হলমার্ক, ডেসটিনি, ব্যাংকের তহবিল তছরুপ, পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারির মতো ঘটনা কেবল কল্পনাতীত দুর্নীতিরই চিত্র নয়, বিশ্বে আমাদের নানাভাবে কলঙ্কিত করেছে।
দেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংক দখলের চেষ্টা এবং নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্থা, সম্মানিত নাগরিকদের অসম্মান, মানবাধিকার কর্মী আদিলুর রহমান খান ও সাংবাদিক মাহমুদুর রহমানের ওপর নিবর্তনের ঘটনা সমাজের শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিদের আতঙ্কিত করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইতিহাসের পৃষ্ঠা নাগরিকদের রক্তে সিক্ত হয়েছে। ঢাকায় হেফাজতের সমাবেশে নিষ্ঠুর আক্রমণ, পিলখানা হত্যাযজ্ঞ, বিচারবহির্ভূত অবাধ হত্যাকাণ্ড, ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, শ্রমিক নেতা আমিনুলসহ বহু রাজনৈতিক নেতাকর্মীর গুম, খুন জনজীবনকে আতঙ্কিত করে রেখেছে। বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ ও নগ্ন দলীয়করণে মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত।
সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি, নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান বাবু হত্যাকারীরা বিচারের আওতায় আসেনি। ক্ষমতাসীনরা দ্রুত পেয়ে যান তাদের কাঙ্ক্ষিত রায়। খুনের মামলার আসামিরা মুক্তি পায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমায়। আইনের শাসন সুদূরপরাহত। প্রশাসন, পুলিশকে সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে ব্যবহার এবং সরকারি দলের ছাত্র ও যুব শাখার সন্ত্রাসী কার্যক্রম শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সম্পদ দখল, তাদের উপাসনালয়ে হামলার নৃশংস ঘটনা আমাদের কলঙ্কিত করেছে। জাতীয় ঐক্যকে করেছে বিপন্ন। এই অবস্থায় জাতীয় ঐক্যকে সংহত করা এবং জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।
দেশ শাসনের রূপরেখা
ক্ষমতায় গেলে ১৮ দল কী করবে বক্তৃতায় সেই বিষয়ে একটি রূপরেখাও তুলে ধরেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, আমরা জনগণের সমর্থনে আগামীতে সরকারে গেলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে মিলে আমরা একযোগে কাজ করব। বিদ্যমান সম্পর্ক বহাল রাখার পাশাপাশি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর নতুন পথের সন্ধান আমরা করব। আমি বিশ্বাস করি, শান্তি, স্থিতি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা এই অঞ্চলের জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন ও বিকাশের ভিত্তি। এই চারটি বিষয়কে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের অভিন্ন স্বপ্ন রূপায়ণের অপরিহার্য উপাদান বলেও আমি মনে করি।
তিনি বলেন, এ কথা অস্বীকার করার জো নেই যে, এই অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে নানা রকম সমস্যা রয়ে গেছে এবং কিছু সমস্যা হয়তো ভবিষ্যতেও থাকবে। পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চল থেকে এটা কোনো আলাদা চিত্র নয়। তবে একই সঙ্গে আমি মনে করি, কোনো সমস্যাই সমাধানের অযোগ্য নয়। পারস্পরিক স্বার্থ ও মর্যাদা বজায় রেখে আন্তরিক সংলাপ ও অব্যাহত মতবিনিময়ের মাধ্যমে আমরা প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যকার বিরাজমান সমস্যাবলি নিরসন করতে পারি। তবে সমস্যা নিরসনের জন্য কেবল সরকারের সঙ্গে সরকারের আলোচনাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলা এবং এক্ষেত্রে জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক স্থাপনকে আমরা গুরুত্ব দেব।
খালেদা জিয়া বলেন, আমরা যদি আগামীতে সরকারে যেতে পারি, তাহলে কোনো দলের সরকার হওয়ার বদলে আমরা জনগণের সত্যিকারের প্রতিনিধি হব। আমাদের আগামী প্রজন্ম যাতে একটি উন্নত জীবনমান পায় আমরা সে ধরনের নীতিমালা বাস্তবায়ন করব। আমরা পশ্চাত্মুখী হব না। আমাদের দৃষ্টি হবে সম্মুখপ্রসারী। আমরা এমন সব নীতিমালা গ্রহণ করব, যাতে সমাজের সব স্তরে ও খাতে টেকসই উন্নয়ন ঘটতে পারে।
তিনি বলেন, আজকের দুনিয়া একটি বিশ্বসমাজে পরিণত হয়েছে। কোনো দেশ ও অঞ্চলই এখন আর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে থাকতে পারে না। তাই আমাদের বিশ্বসমাজের শরিক হিসেবে ভূমিকা ও অবদান রাখতে হবে। বাংলাদেশ অস্থিতিশীল হলে দক্ষিণ এশিয়া অস্থিতিশীল হবে। আর দক্ষিণ এশিয়া অস্থিতিশীল হলে বিশ্বসমাজে তার প্রভাব পড়বে। সে কারণেই আমরা এমন নীতি গ্রহণ করব, যা দেশের এবং আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা জোরদার করবে। শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ এক বিশ্বসমাজ গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ও আমাদের প্রতিবেশী সব দেশ যাতে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে, আগামীতে আমাদের সরকার সেভাবেই কাজ করবে।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা-সুরক্ষা
খালেদা জিয়া ক্ষমতায় গেলে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বিধানে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়ে বলেন, বাংলাদেশী হিসেবে আমরা নানা গৌরবগাথায় পরিপূর্ণ এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় এক মহান জাতি। সাংস্কৃতিক, নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে আমাদের সবার পরিচয় আমরা বাংলাদেশী।
তিনি বলেন, আমি বহুবার বলেছি, আজ আবারও বলছি, আমরা বাংলাদেশের কোনো নাগরিক কিংবা গোষ্ঠীকে সংখ্যালঘু বলে বিবেচনা করি না। আমাদের সবার অভিন্ন পরিচয়—আমরা বাংলাদেশী। এদেশের প্রতিটি নাগরিকের সংবিধান ও আইনের আওতায় সুরক্ষা এবং নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সম্পূর্ণ সমান।
আমাদের উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় পরিচয়ে যারা সংখ্যায় কম, সেই নাগরিকরা অনেক সময় অরক্ষিত হয়ে পড়েন। কখনও কখনও তারা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকেন।
আইনের আওতায় তারা যথাযথ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা পান না। তাদের বাড়ি-ঘর ও উপাসনালয়ে হামলার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে। তাদের সম্পদ দখল করা হয়। তারা নিজেরাও আক্রান্ত ও হেনস্থার শিকার হন। এটা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। আমরা সরকারে গেলে সব নাগরিকের সমনিরাপত্তা নিশ্চিত করব।
কোনো সম্প্রদায়ের জীবন, সম্পদ, উপাসনালয় ও সম্ভ্রমের ওপর হামলা হলে এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিককালে বৌদ্ধ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের ওপর আক্রমণ এবং ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য আমরা বারবার আহ্বান জানিয়েছি। বর্তমান সরকার তা করেনি। আমরা সরকারে গেলে এ জাতীয় সব ঘটনার ব্যাপারে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে অপরাধীদের চিহ্নিত ও শাস্তি বিধান নিশ্চিত করা হবে।
খালেদা জিয়া বলেন, সংযম ও সহিষ্ণুতাই হচ্ছে সভ্যতার লক্ষণ। আমাদের সর্বোচ্চ সংযম ও সহিষ্ণুতা অর্জন করতে হবে। আমরা যে সমাজে বাস করি, সেখানে কেবল ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ থাকাই যথেষ্ট নয়; চিন্তার বিভিন্নতা ও বৈচিত্র্যকে আমাদের স্বাগত জানাতে হবে এবং ভিন্নমতকে সম্মান দিতে হবে। আমাদের অবশ্যই বৈচিত্র্যের মধ্যে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। আমাদের ভবিষ্যত্ নির্ভর করে এমন এক বাংলাদেশ গড়ার ওপর, যেখানে ধর্ম, গোত্র, নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ও রাজনৈতিক মতামত নির্বিশেষে সব নাগরিক তাদের উন্নত জীবনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সমান সুযোগ এবং অধিকার পাবে। যেখানে প্রত্যেকে বাস করতে পারবে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশে। যেখানে প্রত্যেকের জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রমের নিরাপত্তা হবে সম্পূর্ণ হুমকিমুক্ত।
জঙ্গিবাদের বিস্তার আওয়ামী আমলে
বেগম খালেদা জিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে তার সরকারের উন্নয়নের যে ফিরিস্তি দেয়া হয়েছে আমি সে সম্পর্কে মন্তব্য করব না। কোন সরকারের আমলে দেশ কতটা এগিয়েছে ও পিছিয়েছে তা দেশবাসী ভালো জানেন। কতটা শান্তিতে, স্বস্তিতে, নিরাপত্তায় তারা আছেন, উন্নতির ফল তারা কতটা ভোগ করছেন তা জনগণ তাদের নিত্যদিনের জীবনযাপন ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বুঝতে পারেন। তবে তিনি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে অতীতে ফিরে গিয়ে আমাদের সরকারের আমল নিয়ে অসত্য বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন।
খালেদা জিয়া বলেন, আমাদের সময়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিস্তারের অভিযোগ তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশবাসী জানেন, এই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিস্তার আওয়ামী লীগের বিগত সরকারের আমলেই ঘটেছিল। যশোরে উদীচীর গানের আসরে, রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে, পল্টনে সিপিবির জনসভাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সমাবেশে এবং খুলনায় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ে, বানিয়ারচরে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের গির্জায় জঙ্গি ও সন্ত্রাসী হামলায় বহু নিরপরাধ মানুষ জীবন দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নিজের জেলা গোপালগঞ্জে বিপুল আকৃতির শক্তিশালী বোমা পাওয়ার ঘটনা তার আমলেই ঘটেছিল। এসব ঘটনার সুষ্ঠু কোনো তদন্ত ও বিচার হয়নি; বরং প্রকৃত সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের আড়াল করে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে বিষোদগার ও দায়িত্বশীল নেতাদের গ্রেফতার করে হেনস্থা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে সৃষ্ট এই জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস আমাদের সরকারের আমলেও অব্যাহত ছিল। তবে আমরা জঙ্গিদের শনাক্ত করতে সক্ষম হই। তাদের সংগঠন ও তত্পরতা নিষিদ্ধ করি। শীর্ষ জঙ্গি নেতাদের গ্রেফতার ও তাদের বিচারের ব্যবস্থা করি। আমাদের সরকারের আমলেই শীর্ষ জঙ্গিদের বিচারে মৃত্যুদণ্ড হয়, পরে তা কার্যকর করা হয়েছে। আমাদের সর্বাত্মক প্রয়াসে জঙ্গিবাদের নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ ভেঙে দেয়া সম্ভব হয়।
র্যাব প্রসঙ্গে
খালেদা জিয়া বলেন, আমরা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠন করি। এই বাহিনী ব্যাপক সাফল্য ও সুনাম অর্জন করে। র্যাবকে আমরা কখনও বিরোধী দলের কর্মসূচি দমনের কাজে অথবা অন্য কোনো রাজনৈতিক বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করিনি। আমরা এই দমন অভিযানের পাশাপাশি মুসলিম প্রধান এই দেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জনমতকে সংগঠিত করার জন্য ধর্মপ্রাণ মানুষ ও আলেম সমাজকেও কাজে লাগাই। এতে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ধর্মপ্রাণ মানুষও সোচ্চার হয়ে উঠেন।
তিনি বলেন, শান্তিপ্রিয় ধর্মীয় সংগঠন ও ধর্মভিত্তিক নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জঙ্গিবাদকে একাকার করে দেখার ভুল নীতি গ্রহণের কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সমাজে উত্তেজনা ও সংঘাত বেড়েছে। এতে করে জঙ্গিবাদবিরোধী কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
খালেদা জিয়া বলেন, আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই যে, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী আন্তর্জাতিক লড়াইয়ে বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। আমাদের সরকারের আমলে আমরাই এর সূচনা করেছি। আগামীতে এ লড়াই কেবল অব্যাহতই থাকবে না, সন্ত্রাসবিরোধী আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের সক্রিয় সদস্য হিসেবে অন্যান্য দেশ ও সংস্থার সঙ্গে মিলে এই সহযোগিতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ আমরা নেব। আমাদের মনে রাখতে হবে, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ শান্তি এবং স্থিতিশীলতার শত্রু। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগকে ব্যাহত করে। সর্বোপরি এই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ আমাদের জাতীয় স্বার্থকে বিপন্ন করে, আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্ম পবিত্র ইসলাম ও মুসলমানদের সুনাম ক্ষুণ্ন করে।
খালেদা জিয়া বলেন, আন্তঃদেশীয় এই অপরাধ বাংলাদেশের শুধু নয়, বিশ্বের নাগরিকদের জীবনমানকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। বাংলাদেশের মাটিকে দেশীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অথবা অন্য কোনো ধরনের সন্ত্রাসী তত্পরতায় কখনও ব্যবহার করতে না দেয়ার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণে আমরা দৃঢ় অঙ্গীকারাবদ্ধ।
যারা উপস্থিত ছিলেন
সংবাদ সম্মেলনে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আর এ গনি, লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ.স.ম হান্নান শাহ, এম কে আনোয়ার এমপি, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার এমপি, সারোয়ারি রহমান, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, ড. আবদুল মঈন খান, সিনিয়র নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, আবদুল্লাহ আল নোমান, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ড. ওসমান ফারুক, মুশফিকুর রহমান, অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, অধ্যাপক এম এ মান্নান, মীর নাসির উদ্দিন, ইনাম আহমেদ চৌধুরী, আবদুল আউয়াল মিন্টু, শামসুজ্জামান দুদু, রুহুল আলম চৌধুরী, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন, অ্যাডভোকেট এ জে মোহাম্মদ আলী, সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, আবদুল কাইয়ুম, আমান উল্লাহ আমান, বরকত উল্লাহ বুলু, সালাহউদ্দিন আহমেদ, মিজানুর রহমান মিনু, ফজলুল হক মিলন, নিতাই রায় চৌধুরী, জয়নুল আবদিন ফারুক এমপি, নাজিম উদ্দিন আলম, মোশাররফ হোসেন, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এমপি, আবুল খায়ের ভূঁইয়া এমপি, খায়রুল কবীর খোকন ও প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এতে ১৮ দলীয় জোটের এলডিপির ড. অলি আহমেদ এমপি, ড. রেদোয়ান আহমেদ, জামায়াতে ইসলামীর অধ্যাপক এ কে এম নজির আহমেদ, ইসলামী ঐক্যজোটের মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী, খেলাফত মজলিশের মহাসচিব অধ্যাপক ড. আহমদ আবদুল কাদের, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, এনপিপির শেখ শওকত হোসেন নিলু, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, এনডিপির খন্দকার গোলাম মুর্তজা, ইসলামিক পার্টির আবদুল মোবিন, লেবার পার্টি ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ন্যাপের জেবেল রহমান গানি, মুসলিম লীগের এ এইচ এম কামরুজ্জামান খান, পিপলস লীগের গরীবে নেওয়াজ, ন্যাপ ভাসানীর শেখ আনোয়ারুল হক, জমিয়তে উলামা ইসলামের অ্যাডভোকেট শাহীনুর পাশা চৌধুরী , ডেমোক্র্যাটিক লীগের সাইফুদ্দিন মনি প্রমুখ নেতা ছিলেন।
খালেদা জিয়া বলেছেন, ১৯৯৬ ও ২০০১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২০ উপদেষ্টার মধ্য থেকে ১০ জনকে নিয়ে এ সরকার গঠন করা হবে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপি পাঁচটি করে নাম প্রস্তাব করবে। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের ঐক্যমতের ভিত্তিতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন সম্মানিত নাগরিককে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হবে। শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী শিগগিরই এ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
গতকাল বিকালে গুলশানের হোটেল ওয়েস্টিনে বহুল প্রত্যাশিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ প্রস্তাব উত্থাপন করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আশাবাদ ব্যক্ত করেন, বিপর্যয় মোকাবিলায় সক্ষম এ জাতি অচিরেই বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট থেকে মুক্তি পাবে।
তিনি বলেন, আমরা সংঘাত নয়—সমঝোতা চাই। স্বৈরশাসন নয়, গণতন্ত্র চাই। আমরা লগি-বৈঠার তাণ্ডব, গান পাউডার দিয়ে পুড়িয়ে বাসযাত্রীদের হত্যা, অফিস যাত্রীদের দিগম্বর করার কুসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। বাংলাদেশের মানুষ অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি এবং
পরিবর্তনের প্রত্যাশায় উন্মুখ হয়ে আছে। সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, আসুন আমরা সবাই তাদের সেই প্রত্যাশার প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিই।
খালেদা জিয়া তার ও পরিবারের প্রতি যারা অত্যাচার করেছেন তাদের ক্ষমা করার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, তাদের প্রতি আমার কোনো প্রতিহিংসা নেই। আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম। আমরা ক্ষমতায় গেলেও তাদের প্রতি কোনো প্রতিশোধ নেয়া হবে না।
আওয়ামী লীগের প্রচারণার জবাব দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিস্তার আওয়ামী লীগের বিগত সরকারের আমলেই ঘটেছিল।
গত শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় মন্ত্রিসভার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সরকারের জন্য বিরোধী দলের কাছে নামও চান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের তিনদিন পর সোমবার এই প্রস্তাব তুললেন বিএনপি চেয়ারপারসন।
গতকাল বিকাল ৪টা ১০ মিনিটে হোটেল ওয়েস্টিনে এই সংবাদ সম্মেলন শুরু হয়। ৪৪ মিনিট স্থায়ী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর সর্বদলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাব, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা, দেশে বর্তমান অবস্থা, ক্ষমতায় গেলে তার সরকারের করণীয় বিষয়গুলো তুলে ধরেন। শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে চারদলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে যেসব বক্তব্য রেখেছেন, সে সম্পর্কেও জবাব দেন খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার প্রস্তাবে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারের যে অস্পষ্ট ধারণা তুলে ধরেছেন তাতে সেই অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান কে হবেন তা খোলাসা করেননি। এতে নাগরিকদের মধ্যে এই সংশয় রয়ে গেছে যে, তিনি সংসদ বহাল ও নিজের হাতে ক্ষমতা এবং প্রশাসন কুক্ষিগত রেখে বিরোধী দলকে এক অসম প্রতিযোগিতায় আহ্বান জানাচ্ছেন। এটি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের গণদাবি’ সম্পর্কে কোনো আলোচনার অবকাশ না রেখে একতরফাভাবে শুধু নিজের সুবিধা অনুযায়ী একটি প্রস্তাব তুলেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে জাতি হতাশ হয়েছে মন্তব্য করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমি এখনও মনে করি, আলোচনার মাধ্যমেই বিষয়টির সুরাহা করা দরকার। এবং সেটা যত দ্রুত হয়, ততই মঙ্গল। এ লক্ষ্যেই বিএনপি ও ১৮ দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের এ প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি।
খালেদা জিয়া বলেন, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণভিত্তিক দুটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই দুটি সরকারের উপদেষ্টারা তাদের নিরপেক্ষতার জন্য সব মহলে প্রশংসিত হয়েছিলেন।
তিনি আশা করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে দু’পক্ষের মধ্যে দ্রুত আলোচনার কার্যকর উদ্যোগ নেবেন। সাংবিধানিকভাবে এই নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের জন্যও আমি তার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।
সাংবিধানিকভাবে কীভাবে এই সরকার গঠন করা যায় তারও একটি প্রস্তাব রয়েছে খালেদা জিয়ার বক্তব্যে।
বিদ্যমান সংবিধান ঠিক রাখলে সংসদ নেতার প্রতি পরামর্শ রেখে খালেদা জিয়া বলেন, আমি বলতে চাই বর্তমান সংসদ ভেঙে যাওয়ার আগে প্রয়োজনবোধে ওই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে নির্বাচিত করা যেতে পারে। সংসদ যেভাবে রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্যদের নির্বাচিত করে থাকে সেভাবেই এই উপদেষ্টাদের নির্বাচিত করা হবে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের যে দোহাই দিচ্ছেন, তা তারা নিজেরাই যথেচ্ছ রদবদল করে সঙ্কট সৃষ্টি করেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ রুদ্ধ করেছেন এবং জনগণের ভোটাধিকার হরণের সুযোগ তৈরি করেছেন। জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের কেবল নির্বাচনের তারিখ নিয়ে বিরোধী দলের পরামর্শ চেয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
প্রধানমন্ত্রী সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দেয়ার তিনদিন পর বিরোধীদলীয় নেতা তার অবস্থান পরিষ্কার করলেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের বিষয়ে খালেদা জিয়া গত দু’দিনে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি এবং ১৮ দলীয় জোট নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে জাতি হতাশ
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ জাতিকে হতাশ করেছে বলে মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, আমরা বারবার আশা করি সরকার জনগণের নির্দলীয় সরকারের দাবির প্রতি সম্মান জানাবে। কিন্তু তাদের অনড় অবস্থান, যুদ্ধংদেহী আচরণ সবাই হতাশ করেছে।
তিনি বলেন, সবার আশা ছিল ভাষণে দেশবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষার ব্যাপারে সুস্পষ্ট বক্তব্য থাকবে; কিন্তু তা না থাকায় বিরোধী রাজনৈতিক দল ও দেশবাসী হতাশ হয়েছেন।
১৮ দলের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ
খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি ও ১৮ দলীয় জোটসহ সব বিরোধী দল ও বাংলাদেশের জনগণ জাতীয় নির্বাচনকালীন একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার। আমরা শান্তিপূর্ণ পন্থায় এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছি মূলত গণসংযোগ ও প্রচারাভিযানের মাধ্যমে। আমরা আশা করেছিলাম, সরকার জনগণের দাবির প্রতি সম্মান দেখাবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশার অনুকূলে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে।
ক্ষমার ঘোষণা
জিয়া পরিবারকে যারা হেয় করেছেন, তাদের প্রতি কোনো প্রতিহিংসা নেই বলে জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, যারা অতীতে জিয়া পরিবারকে হেয় করেছেন, কুত্সা রটিয়েছেন, তাদের প্রতি আমার কোনো প্রতিহিংসা নেই। আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম। আমরা ক্ষমতায় গেলেও তাদের প্রতি কোনোপ্র্রতিশোধ নেয়া হবে না।
আওয়ামী দুঃশাসনের খণ্ডচিত্র
বিএনপি চেয়ারপারসন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের কর্মকাণ্ড তুলে ধরে বলেন, গত কয়েক বছরে একের পর এক ঘটে গেছে নানা মর্মান্তিক ঘটনা। রানা প্লাজা ধসে হাজারের বেশি শ্রমজীবী মানুষের করুণ মৃত্যু হয়েছে। এতে দেশবাসী স্তম্ভিত। এই শোচনীয় ঘটনা বিশ্ববিবেককেও নাড়িয়ে দিয়েছে।
শেয়ারবাজারের নিষ্ঠুর লুণ্ঠনে ৩৩ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী পথে বসেছে। হলমার্ক, ডেসটিনি, ব্যাংকের তহবিল তছরুপ, পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারির মতো ঘটনা কেবল কল্পনাতীত দুর্নীতিরই চিত্র নয়, বিশ্বে আমাদের নানাভাবে কলঙ্কিত করেছে।
দেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংক দখলের চেষ্টা এবং নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্থা, সম্মানিত নাগরিকদের অসম্মান, মানবাধিকার কর্মী আদিলুর রহমান খান ও সাংবাদিক মাহমুদুর রহমানের ওপর নিবর্তনের ঘটনা সমাজের শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিদের আতঙ্কিত করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইতিহাসের পৃষ্ঠা নাগরিকদের রক্তে সিক্ত হয়েছে। ঢাকায় হেফাজতের সমাবেশে নিষ্ঠুর আক্রমণ, পিলখানা হত্যাযজ্ঞ, বিচারবহির্ভূত অবাধ হত্যাকাণ্ড, ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, শ্রমিক নেতা আমিনুলসহ বহু রাজনৈতিক নেতাকর্মীর গুম, খুন জনজীবনকে আতঙ্কিত করে রেখেছে। বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ ও নগ্ন দলীয়করণে মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত।
সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি, নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান বাবু হত্যাকারীরা বিচারের আওতায় আসেনি। ক্ষমতাসীনরা দ্রুত পেয়ে যান তাদের কাঙ্ক্ষিত রায়। খুনের মামলার আসামিরা মুক্তি পায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমায়। আইনের শাসন সুদূরপরাহত। প্রশাসন, পুলিশকে সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে ব্যবহার এবং সরকারি দলের ছাত্র ও যুব শাখার সন্ত্রাসী কার্যক্রম শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সম্পদ দখল, তাদের উপাসনালয়ে হামলার নৃশংস ঘটনা আমাদের কলঙ্কিত করেছে। জাতীয় ঐক্যকে করেছে বিপন্ন। এই অবস্থায় জাতীয় ঐক্যকে সংহত করা এবং জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।
দেশ শাসনের রূপরেখা
ক্ষমতায় গেলে ১৮ দল কী করবে বক্তৃতায় সেই বিষয়ে একটি রূপরেখাও তুলে ধরেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, আমরা জনগণের সমর্থনে আগামীতে সরকারে গেলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে মিলে আমরা একযোগে কাজ করব। বিদ্যমান সম্পর্ক বহাল রাখার পাশাপাশি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর নতুন পথের সন্ধান আমরা করব। আমি বিশ্বাস করি, শান্তি, স্থিতি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা এই অঞ্চলের জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন ও বিকাশের ভিত্তি। এই চারটি বিষয়কে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের অভিন্ন স্বপ্ন রূপায়ণের অপরিহার্য উপাদান বলেও আমি মনে করি।
তিনি বলেন, এ কথা অস্বীকার করার জো নেই যে, এই অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে নানা রকম সমস্যা রয়ে গেছে এবং কিছু সমস্যা হয়তো ভবিষ্যতেও থাকবে। পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চল থেকে এটা কোনো আলাদা চিত্র নয়। তবে একই সঙ্গে আমি মনে করি, কোনো সমস্যাই সমাধানের অযোগ্য নয়। পারস্পরিক স্বার্থ ও মর্যাদা বজায় রেখে আন্তরিক সংলাপ ও অব্যাহত মতবিনিময়ের মাধ্যমে আমরা প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যকার বিরাজমান সমস্যাবলি নিরসন করতে পারি। তবে সমস্যা নিরসনের জন্য কেবল সরকারের সঙ্গে সরকারের আলোচনাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলা এবং এক্ষেত্রে জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক স্থাপনকে আমরা গুরুত্ব দেব।
খালেদা জিয়া বলেন, আমরা যদি আগামীতে সরকারে যেতে পারি, তাহলে কোনো দলের সরকার হওয়ার বদলে আমরা জনগণের সত্যিকারের প্রতিনিধি হব। আমাদের আগামী প্রজন্ম যাতে একটি উন্নত জীবনমান পায় আমরা সে ধরনের নীতিমালা বাস্তবায়ন করব। আমরা পশ্চাত্মুখী হব না। আমাদের দৃষ্টি হবে সম্মুখপ্রসারী। আমরা এমন সব নীতিমালা গ্রহণ করব, যাতে সমাজের সব স্তরে ও খাতে টেকসই উন্নয়ন ঘটতে পারে।
তিনি বলেন, আজকের দুনিয়া একটি বিশ্বসমাজে পরিণত হয়েছে। কোনো দেশ ও অঞ্চলই এখন আর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে থাকতে পারে না। তাই আমাদের বিশ্বসমাজের শরিক হিসেবে ভূমিকা ও অবদান রাখতে হবে। বাংলাদেশ অস্থিতিশীল হলে দক্ষিণ এশিয়া অস্থিতিশীল হবে। আর দক্ষিণ এশিয়া অস্থিতিশীল হলে বিশ্বসমাজে তার প্রভাব পড়বে। সে কারণেই আমরা এমন নীতি গ্রহণ করব, যা দেশের এবং আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা জোরদার করবে। শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ এক বিশ্বসমাজ গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ও আমাদের প্রতিবেশী সব দেশ যাতে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে, আগামীতে আমাদের সরকার সেভাবেই কাজ করবে।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা-সুরক্ষা
খালেদা জিয়া ক্ষমতায় গেলে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বিধানে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়ে বলেন, বাংলাদেশী হিসেবে আমরা নানা গৌরবগাথায় পরিপূর্ণ এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় এক মহান জাতি। সাংস্কৃতিক, নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে আমাদের সবার পরিচয় আমরা বাংলাদেশী।
তিনি বলেন, আমি বহুবার বলেছি, আজ আবারও বলছি, আমরা বাংলাদেশের কোনো নাগরিক কিংবা গোষ্ঠীকে সংখ্যালঘু বলে বিবেচনা করি না। আমাদের সবার অভিন্ন পরিচয়—আমরা বাংলাদেশী। এদেশের প্রতিটি নাগরিকের সংবিধান ও আইনের আওতায় সুরক্ষা এবং নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সম্পূর্ণ সমান।
আমাদের উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় পরিচয়ে যারা সংখ্যায় কম, সেই নাগরিকরা অনেক সময় অরক্ষিত হয়ে পড়েন। কখনও কখনও তারা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকেন।
আইনের আওতায় তারা যথাযথ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা পান না। তাদের বাড়ি-ঘর ও উপাসনালয়ে হামলার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে। তাদের সম্পদ দখল করা হয়। তারা নিজেরাও আক্রান্ত ও হেনস্থার শিকার হন। এটা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। আমরা সরকারে গেলে সব নাগরিকের সমনিরাপত্তা নিশ্চিত করব।
কোনো সম্প্রদায়ের জীবন, সম্পদ, উপাসনালয় ও সম্ভ্রমের ওপর হামলা হলে এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিককালে বৌদ্ধ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের ওপর আক্রমণ এবং ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য আমরা বারবার আহ্বান জানিয়েছি। বর্তমান সরকার তা করেনি। আমরা সরকারে গেলে এ জাতীয় সব ঘটনার ব্যাপারে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে অপরাধীদের চিহ্নিত ও শাস্তি বিধান নিশ্চিত করা হবে।
খালেদা জিয়া বলেন, সংযম ও সহিষ্ণুতাই হচ্ছে সভ্যতার লক্ষণ। আমাদের সর্বোচ্চ সংযম ও সহিষ্ণুতা অর্জন করতে হবে। আমরা যে সমাজে বাস করি, সেখানে কেবল ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ থাকাই যথেষ্ট নয়; চিন্তার বিভিন্নতা ও বৈচিত্র্যকে আমাদের স্বাগত জানাতে হবে এবং ভিন্নমতকে সম্মান দিতে হবে। আমাদের অবশ্যই বৈচিত্র্যের মধ্যে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। আমাদের ভবিষ্যত্ নির্ভর করে এমন এক বাংলাদেশ গড়ার ওপর, যেখানে ধর্ম, গোত্র, নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ও রাজনৈতিক মতামত নির্বিশেষে সব নাগরিক তাদের উন্নত জীবনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সমান সুযোগ এবং অধিকার পাবে। যেখানে প্রত্যেকে বাস করতে পারবে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশে। যেখানে প্রত্যেকের জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রমের নিরাপত্তা হবে সম্পূর্ণ হুমকিমুক্ত।
জঙ্গিবাদের বিস্তার আওয়ামী আমলে
বেগম খালেদা জিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে তার সরকারের উন্নয়নের যে ফিরিস্তি দেয়া হয়েছে আমি সে সম্পর্কে মন্তব্য করব না। কোন সরকারের আমলে দেশ কতটা এগিয়েছে ও পিছিয়েছে তা দেশবাসী ভালো জানেন। কতটা শান্তিতে, স্বস্তিতে, নিরাপত্তায় তারা আছেন, উন্নতির ফল তারা কতটা ভোগ করছেন তা জনগণ তাদের নিত্যদিনের জীবনযাপন ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বুঝতে পারেন। তবে তিনি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে অতীতে ফিরে গিয়ে আমাদের সরকারের আমল নিয়ে অসত্য বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন।
খালেদা জিয়া বলেন, আমাদের সময়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিস্তারের অভিযোগ তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশবাসী জানেন, এই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিস্তার আওয়ামী লীগের বিগত সরকারের আমলেই ঘটেছিল। যশোরে উদীচীর গানের আসরে, রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে, পল্টনে সিপিবির জনসভাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সমাবেশে এবং খুলনায় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ে, বানিয়ারচরে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের গির্জায় জঙ্গি ও সন্ত্রাসী হামলায় বহু নিরপরাধ মানুষ জীবন দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নিজের জেলা গোপালগঞ্জে বিপুল আকৃতির শক্তিশালী বোমা পাওয়ার ঘটনা তার আমলেই ঘটেছিল। এসব ঘটনার সুষ্ঠু কোনো তদন্ত ও বিচার হয়নি; বরং প্রকৃত সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের আড়াল করে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে বিষোদগার ও দায়িত্বশীল নেতাদের গ্রেফতার করে হেনস্থা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে সৃষ্ট এই জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস আমাদের সরকারের আমলেও অব্যাহত ছিল। তবে আমরা জঙ্গিদের শনাক্ত করতে সক্ষম হই। তাদের সংগঠন ও তত্পরতা নিষিদ্ধ করি। শীর্ষ জঙ্গি নেতাদের গ্রেফতার ও তাদের বিচারের ব্যবস্থা করি। আমাদের সরকারের আমলেই শীর্ষ জঙ্গিদের বিচারে মৃত্যুদণ্ড হয়, পরে তা কার্যকর করা হয়েছে। আমাদের সর্বাত্মক প্রয়াসে জঙ্গিবাদের নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ ভেঙে দেয়া সম্ভব হয়।
র্যাব প্রসঙ্গে
খালেদা জিয়া বলেন, আমরা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠন করি। এই বাহিনী ব্যাপক সাফল্য ও সুনাম অর্জন করে। র্যাবকে আমরা কখনও বিরোধী দলের কর্মসূচি দমনের কাজে অথবা অন্য কোনো রাজনৈতিক বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করিনি। আমরা এই দমন অভিযানের পাশাপাশি মুসলিম প্রধান এই দেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জনমতকে সংগঠিত করার জন্য ধর্মপ্রাণ মানুষ ও আলেম সমাজকেও কাজে লাগাই। এতে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ধর্মপ্রাণ মানুষও সোচ্চার হয়ে উঠেন।
তিনি বলেন, শান্তিপ্রিয় ধর্মীয় সংগঠন ও ধর্মভিত্তিক নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জঙ্গিবাদকে একাকার করে দেখার ভুল নীতি গ্রহণের কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সমাজে উত্তেজনা ও সংঘাত বেড়েছে। এতে করে জঙ্গিবাদবিরোধী কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
খালেদা জিয়া বলেন, আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই যে, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী আন্তর্জাতিক লড়াইয়ে বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। আমাদের সরকারের আমলে আমরাই এর সূচনা করেছি। আগামীতে এ লড়াই কেবল অব্যাহতই থাকবে না, সন্ত্রাসবিরোধী আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের সক্রিয় সদস্য হিসেবে অন্যান্য দেশ ও সংস্থার সঙ্গে মিলে এই সহযোগিতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ আমরা নেব। আমাদের মনে রাখতে হবে, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ শান্তি এবং স্থিতিশীলতার শত্রু। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগকে ব্যাহত করে। সর্বোপরি এই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ আমাদের জাতীয় স্বার্থকে বিপন্ন করে, আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্ম পবিত্র ইসলাম ও মুসলমানদের সুনাম ক্ষুণ্ন করে।
খালেদা জিয়া বলেন, আন্তঃদেশীয় এই অপরাধ বাংলাদেশের শুধু নয়, বিশ্বের নাগরিকদের জীবনমানকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। বাংলাদেশের মাটিকে দেশীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অথবা অন্য কোনো ধরনের সন্ত্রাসী তত্পরতায় কখনও ব্যবহার করতে না দেয়ার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণে আমরা দৃঢ় অঙ্গীকারাবদ্ধ।
যারা উপস্থিত ছিলেন
সংবাদ সম্মেলনে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আর এ গনি, লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ.স.ম হান্নান শাহ, এম কে আনোয়ার এমপি, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার এমপি, সারোয়ারি রহমান, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, ড. আবদুল মঈন খান, সিনিয়র নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, আবদুল্লাহ আল নোমান, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ড. ওসমান ফারুক, মুশফিকুর রহমান, অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, অধ্যাপক এম এ মান্নান, মীর নাসির উদ্দিন, ইনাম আহমেদ চৌধুরী, আবদুল আউয়াল মিন্টু, শামসুজ্জামান দুদু, রুহুল আলম চৌধুরী, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন, অ্যাডভোকেট এ জে মোহাম্মদ আলী, সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, আবদুল কাইয়ুম, আমান উল্লাহ আমান, বরকত উল্লাহ বুলু, সালাহউদ্দিন আহমেদ, মিজানুর রহমান মিনু, ফজলুল হক মিলন, নিতাই রায় চৌধুরী, জয়নুল আবদিন ফারুক এমপি, নাজিম উদ্দিন আলম, মোশাররফ হোসেন, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এমপি, আবুল খায়ের ভূঁইয়া এমপি, খায়রুল কবীর খোকন ও প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এতে ১৮ দলীয় জোটের এলডিপির ড. অলি আহমেদ এমপি, ড. রেদোয়ান আহমেদ, জামায়াতে ইসলামীর অধ্যাপক এ কে এম নজির আহমেদ, ইসলামী ঐক্যজোটের মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী, খেলাফত মজলিশের মহাসচিব অধ্যাপক ড. আহমদ আবদুল কাদের, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, এনপিপির শেখ শওকত হোসেন নিলু, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, এনডিপির খন্দকার গোলাম মুর্তজা, ইসলামিক পার্টির আবদুল মোবিন, লেবার পার্টি ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ন্যাপের জেবেল রহমান গানি, মুসলিম লীগের এ এইচ এম কামরুজ্জামান খান, পিপলস লীগের গরীবে নেওয়াজ, ন্যাপ ভাসানীর শেখ আনোয়ারুল হক, জমিয়তে উলামা ইসলামের অ্যাডভোকেট শাহীনুর পাশা চৌধুরী , ডেমোক্র্যাটিক লীগের সাইফুদ্দিন মনি প্রমুখ নেতা ছিলেন।

No comments:
Post a Comment