Search This Blog

Tuesday, October 22, 2013

রাজনীতিতে নাটকীয় মোড় : আওয়ামী লীগকে বিএনপির চিঠি : ফখরুলকে আশরাফের ফোন

নির্বাচনকালীন সরকারে কারা থাকবে—তা নিয়ে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি প্রস্তাব নিয়ে যখন সারাদেশে তুমুল আলোচনা, তখনই রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নাটকীয় মোড়। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে চিঠি আর সরকারি দলের পক্ষ থেকে ফোনালাপের মধ্য দিয়ে গত কয়েকদিন ধরে রাজনীতিতে চলা ‘উত্তাপ ও আশঙ্কার’ বরফ গলা শুরু হলো।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৮ অক্টোবর জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়ে রাজনীতির বলটি বিরোধী দলের কোর্টে ঠেলে দিয়েছিলেন। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া ২১ অক্টোবর এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পাল্টা একটি প্রস্তাব উত্থাপন করে এবং গতকাল বিএনপির পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগকে চিঠি দিয়ে সেই বলটি সরকারি দলের কোর্টে ফেরত দিল। সবার নজর এখন সরকারি দলের দিকে। আজ আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির কার্যালয়ে যে সংবাদ সম্মেলন রয়েছে, তাতে তারা বিরোধী দলের চিঠির কী জবাব দেন—সেদিকেই এখন জনগণের নজর।
বিএনপির পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগকে চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে, সঙ্কট নিরসনে দ্রুত আলোচনা প্রয়োজন। এজন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে ক্ষমতাসীনদের আহ্বান জানিয়েছে বিরোধী দল। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ওই চিঠি গতকাল সকালে রাজধানীর মিন্টো রোডে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বাড়িতে পৌঁছে দেন দলের তিন নেতা। একই সময় গুলশানে সংবাদ সম্মেলন করে সরকারকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান মির্জা ফখরুল। আর সংলাপের এই উদ্যোগ নাটকীয় মাত্রা পায় সৈয়দ আশরাফের একটি ফোন কলে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব বরকত উল্লাহ বুলু, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক ও সংসদ সদস্য শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি চিঠি নিয়ে সৈয়দ আশরাফের বাড়িতে পৌঁছান বেলা সোয়া ১১টার পর। আর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে মির্জা ফখরুলের সংবাদ সম্মেলন শুরু হয় বেলা সাড়ে ১১টায়।
সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল সোমবার রাতে নয়াপল্টনে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের একটি মাইক্রোবাসে হামলার অভিযোগ এনে বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সহ-সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুকে আটকের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
ফখরুল অভিযোগ করেন, বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচনকালীন সরকারের একটি প্রস্তাব দেয়ার পরপরই পুলিশের এ ধরনের আচরণে প্রমাণ হয়েছে যে, সরকার সমঝোতা চায় না।
এরপর সভা-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে শান্তিপূর্ণ জনসভা করতে চাই। আমাদের ঘোষিত ২৫ অক্টোবরের জনসভাকে হুমকির মুখে ফেলবেন না। আমরা আশা করি সরকার এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনার পথকে উন্মুক্ত করবে।
সংবাদ সম্মেলনের এ পর্যায়ে এসে পাশে দাঁড়ানো ব্যক্তিগত সহকারী ফখরুলের দিকে এগিয়ে দেন ফোন। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরা ও উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য থামিয়ে ফোন কানে দিয়ে আন্তরিক ভঙ্গিতে বিএনপির মুখপাত্র বলে ওঠেন, ‘আসসালামু আলাইকুম ভাই’। টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারে চোখ রাখা দেশের মানুষের সামনেই মিনিটখানেক চলে এই নাটকীয় কথোপকথন।
এ পাশ থেকে ফখরুলকে বলতে শোনা যায়—‘জি, ভালো আছি। আপনি ভালো আছেন?’—‘জি, জি।’ ‘আচ্ছা আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমরা আশা করি, আপনারা এটাকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনাটা শুরু করবেন। আমরা এগিয়ে এসেছি। আপনারাও এগিয়ে আসবেন। থ্যাংক ইউ।’
বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে উপস্থিত সাংবাদিকসহ অনেকেই ততক্ষণে বুঝে গেছেন, ফোনের ওপাশে এতক্ষণ কথা বলছিলেন আওয়ামী লীগ মুখপাত্র সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
ফোন রেখে মির্জা ফখরুল হাসিমুখে হাত নেড়ে ইশারা দিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আমার সঙ্গে সৈয়দ আশরাফ সাহেবের এখনই কথা হয়েছে। টেলিফোনের কথাবার্তার সবকিছুই আপনারা শুনেছেন। তিনি চিঠিটি কিছুক্ষণ আগে গ্রহণ করেছেন। উনি চিঠির জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
তিনি সৈয়দ আশরাফকে উদ্ধৃত করে বলেন, তিনি (সৈয়দ আশরাফ) আমাকে জানিয়েছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দিনাজপুরে ট্র্যাভেল করছেন। এই চিঠিটি তিনি সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন। প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়ে অবহিত করবেন।
মির্জা ফখরুল আশা প্রকাশ করেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের দেয়া চিঠির ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাবে। রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে ও নির্বাচনকালীন সরকার গঠনে সরকার ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
এদিকে গুলশানের ওই সংবাদ সম্মেলনের মধ্যেই মিন্টো রোডে সৈয়দ আশরাফের বাসায় বসে ফখরুলের চিঠি পড়ে শোনান বরকত উল্লাহ বুলু্। ১৩ মিনিটের মধ্যে চিঠি হস্তান্তরপর্ব শেষ করে বাইরে এসে সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদেরও চিঠির বক্তব্য পড়ে শোনান এই বিএনপি নেতা।
চিঠিতে বলা হয়, গত ২১ অক্টোবর সংসদে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনের লক্ষ্যে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন সরকারের একটি প্রস্তাব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশে তার বিবেচনার জন্য সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করেছেন। প্রস্তাবের অংশটুকু আপনার কাছে পাঠালাম। এ বিষয়ে অবিলম্বে আলোচনা শুরু করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে আপনাকে সবিনয় অনুরোধ জানাচ্ছি।
এদিকে আওয়ামী লীগও আজ সকাল ১১টায় ধানমন্ডিতে দলীয় প্রধানের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে। ওই সংবাদ সম্মেলনেই বিএনপির আহ্বানের জবাব আসতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
দশম সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জনমনে রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যেই গত শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় মন্ত্রিসভার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সরকারের জন্য বিরোধী দলের কাছে নামও চান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের তিন দিন পর সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে ওই প্রস্তাবের পাশাপাশি বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া ভিন্ন একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এর বদলে একজন ‘সম্মানিত নাগরিকের’ নেতৃত্বে সাবেক ১০ উপদেষ্টাকে নিয়ে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পাল্টা প্রস্তাব দেন খালেদা জিয়া।
তার প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৯৬ ও ২০০১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২০ উপদেষ্টার মধ্য থেকে ১০ জনকে নিয়ে এ সরকার হবে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপি পাঁচটি করে নাম প্রস্তাব করবে। আর ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের ‘ঐকমত্যের ভিত্তিতে’ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন ‘সম্মানিত নাগরিককে’ এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হবে।
‘শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের স্বার্থে’ প্রধানমন্ত্রী শিগগিরই এ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনের পর সোমবার সন্ধ্যায় তার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূূত ড্যান মজীনা, যিনি বরাবরই সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনের তাগিদ দিয়ে আসছেন।
বৈঠকের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাব উত্থাপনের পর আলোচনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
এই অচলাবস্থা নিরসনে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীনসহ দাতা দেশগুলো বাংলাদেশের প্রধান দু’দলের সংলাপ অনুষ্ঠানের ওপর জোর দিয়ে আসছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে একাধিকবার আলোচনার আহ্বান জানানো হলেও এর আগে কার্যকর কোনো উদ্যোগ আর দেখা যায়নি।

No comments:

Post a Comment